রূপক মজুমদার, বর্ধমান
বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রটি মূলত বর্ধমান পুরসভার ৩৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এ বারের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গিয়েছে, এই ওয়ার্ডগুলির মধ্যেই তৃণমূল প্রার্থী খোকন দাসের পরাজয়ের মূল কারণ লুকিয়ে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ৩৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৮টি ওয়ার্ডে খোকন লিড পেয়েছেন এবং বাকি ২৭টি ওয়ার্ডেই বিপুল জয় পান বিজেপির প্রার্থী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র। বিশেষ করে ১২ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থী ৩৬১৭ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। এমনকী খোকন দাস তাঁর নিজের এলাকা রথতলা ও কাঞ্চননগরেও পরাজিত হয়েছেন।
হারের নেপথ্যে শহরের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ স্পষ্ট হয়েছে। বিসি রোডের কাপড়ের ব্যবসায়ী অশোক সাহা ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের ব্যবসার সিজনটা উনি নষ্ট করে দিয়েছেন। রাস্তা করার নামে কার্জন গেট থেকে উত্তর ফটক অবধি গোটা বিসি রোড খুঁড়ে এ উন্নয়ন করতে গেলেন ভোটের আগে।
বিগত চার বছর ধরে ঘুমোচ্ছিলেন!' প্রায় একই সুর রাধানগর পাড়ার বাসিন্দা মহাদেব মিত্রের গলায়। তিনি বলেন, 'বিধায়ক হয়ে কী কাজ করেছেন, তার হিসাব দিতে পারেননি। বর্ধমান শহরের বিসি রোডের রাস্তার ধারে যে গর্ত কেটেছিলেন, সেই গর্তেই ডুবেছেন। একেবারে অপরিকল্পিত ভাবে নিজের খেয়াল খুশি মতো কাজ করেছেন। তার ফল মানুষ ওঁকে দিয়েছেন। এটা হওয়ারই ছিল।'
ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আরও গুরুতর। কার্জন গেটের ফুটপাথে ব্যবসা করেন লক্ষ্মণ সাহা। তোলাবাজির অভিযোগ তুলে বলেন, 'আমাদের কাছ থেকেও ওর লোকেরা এসে তোলাবাজি করেছে। দোকান বন্ধ করে মিটিংয়ে, মিছিলে যেতে হয়েছে। না-হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি ছিল।' খোকনের আচরণ ও রণকৌশল নিয়ে দলের ভিতর থেকেও প্রশ্ন উঠছে। মিঠা পুকুর এলাকার তৃণমূল কর্মী মহাদেব বিশ্বাস বলেন, 'এত বড় একটা নির্বাচনে উনি বিসি রোড দিয়ে শেষ দিন ছাড়া একটাও প্রচার কেন করেননি? কারণ উনি জানতেন, ওখানে রাস্তা তৈরির নামে গর্ত করা হয়েছে। চারপাশে থাকা কিছু লোক ওঁকে যেমন বোঝাতেন, সেটাই শুনতেন। অফিসে গেলে আমাদের সঙ্গে কুকুরের মতো ব্যবহার করতেন। এটা হওয়ারই ছিল। এত অহঙ্কার ভালো নয়।'
শহরের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপির মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র বলেন, 'মানুষ আশীর্বাদ করেছেন কাজ করার জন্য। তা করে দেখাব। শহরে কোনও তোলাবাজি, কাটমানি চলবে না। মানুষ স্বাধীন থাকবেন। কাজ করবেন।'
নিজের অভাবনীয় হার নিয়ে খোকনের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, 'মানুষ ভোট দেননি কেন, তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা করছি।' তবে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারই বর্ধমান শহরে শাসক শিবিরের ভরাডুবির প্রধান কারণ। এই জনমত থেকেই তা পরিষ্কার।