• বিজয়কেতন তো উড়ল, কিন্তু ‘নড়বড়ে’ সরকার ধরে রাখতে পারবেন তো থালাপতি? জল্পনা তামিলভূমে
    এই সময় | ১০ মে ২০২৬
  • মাত্র দু’বছর আগে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। তার মধ্যেই দ্রাবিড়ভূম জয়! গত চার দশক ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতি যে ডিএমকে-এডিএমকে বৃত্তের মধ্যে আবর্তিত, তা ভেঙে দিয়ে রবিবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন থালাপতি বিজয়। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা ভোটে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তাঁর দল টিভিকে। ফলে কংগ্রেস-সহ একাধিক দলের সঙ্গে জোট তৈরি করেই আপাতত সরকার গড়তে হলো বিজয়কে। এই পরিস্থিতিতে তামিলভূমে নতুন জল্পনা— বিজয়কেতন উড়লেও, নড়বড়ে সরকার ধরে রাখতে পারবেন তো থালাপতি?

    টানা পাঁচ দিন ধরে নানা জল্পনা, নাটকীয় পটপরিবর্তনের পর অবশেষে শুক্রবার দুপুরের পরে যবনিকা পড়েছে। সরকার গঠনের প্রশ্নে শনিবার ভিসিকে ও আইইউএমএল বিজয়ের দল টিভিকে-কে সমর্থনের কথা ঘোষণা করার পরেই যাবতীয় অনিশ্চয়তা কেটে যায়। রাজ্যপাল আর এস আরলেকরের কাছে গিয়ে সমর্থনকারী বিধায়কদের চিঠি পেশ করেন বিজয়। তার পরেই তাঁকে সরকার গড়তে আহ্বান করেন রাজ্যপাল। সেই মতো রবিবার চেন্নাইয়ের নেহরু স্টেডিয়ামে শপথ নিলেন বিজয়। মঞ্চে হাজির ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। বিজয়ের সঙ্গে শপথ নিলেন আরও ৯ জন টিভিকে নেতা।

    এ বারের নির্বাচনে টিভিকে ১০৮ আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য যে ১১৮ আসন প্রয়োজন, তা বিজয়ের ছিল না। তাই দু’বার সরকার গড়ার দাবি জানালেও রাজ্যপাল তাঁকে ফিরিয়ে দেন। তারই মাঝে তলে তলে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে ডিএমকে। সূত্রের খবর, রাজনৈতিক তিক্ততাকে দূরে সরিয়ে এডিএমকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ডিএমকে নেতৃত্ব। কিন্তু তাঁদের কাছেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। সেই কারণে ভিসিকে প্রধান থোল তিরুমাভালানকে মুখ্যমন্ত্রী করে তাঁর দুই বিধায়কের সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করে ডিএমকে। কিন্তু তাতে প্রবল আপত্তি জানায় এডিএমকে। বিজয়কে সরকার গঠনে সমর্থনের হুঁশিয়ারি দেন দলের প্রায় ৩০ জন জয়ী প্রার্থী। ঘটনাচক্রে, তার পরেই আইইউএমএল ও ভিসিকে বিজয়কে সমর্থনের কথা ঘোষণা করে। বর্তমানে তাঁর কাছে ১২০ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে।

    রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, সমর্থন কুড়িয়ে ক্ষমতা দখল করলেও, জোট সরকারের চাপ সামলেই চলতে হবে বিজয়কে। যত সময় এগোবে, জোটসঙ্গীদের নানা দাবিদাওয়ার মুখে পড়তে হতে পারে তাঁকে। ফলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই আশঙ্কার কারণ, বিজয়ের দলের অধিকাংশ নেতাই প্রথমবার বিধায়ক হয়েছে। বিজয় নিজেও। ফলে আপাতত সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁরা এখনও ততটাও অভিজ্ঞ নন। কিন্তু শরিক দলগুলির বিধায়কেরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির ময়দানে রয়েছেন। ফলে তাঁরা নানা ভাবে টিভিকে নেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। বিধানসভায় কোনও বিল পাশ করানোর ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে বিজয়ের দলকে।

    যদিও শপথগ্রহণের মঞ্চেই এ বিষয়ে বার্তা দিয়েছেন বিজয়। স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তিনিই হবেন। তাঁকে বাদ রেখে কিছু হবে না। বুঝিয়ে দিয়েছেন, সরকারের ভালো কাজের কৃতিত্ব যদি তাঁর হয়, তা হলে খারাপ কাজেরও দায় তাঁরই। তিনিই তার জবাবদিহি করবেন। এই বার্তার মধ্যে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, জোটসঙ্গীদের চাপে বাধ্য হয়ে তিনি কিছু করবেন না। যা করার সকলকে সঙ্গে নিয়েই করবেন। বিজয় জানান, তিনি রাজপরিবারের কেউ নন। একেবারে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এক ব্যক্তি। সেই কারণেই মানুষ তাঁকে বেছে নিয়েছেন। রাজ্যের উন্নতিতে তাঁর যা পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়িত করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে কিছু সময়ও চেয়েছেন বিজয়। তিনি বলেন, ‘আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারও সঙ্গে প্রতারণা করব না।’

    কুর্সিতে না বসলেও, রাজ্য-রাজনীতির অনেকটা নিয়ন্ত্রণ এখনও ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিনের হাতেই রয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁদের যুক্তি, ভোটে ডিএমকে-র ফল খারাপ হয়েছে। স্ট্যালিন নিজেও হেরেছেন। তা সত্ত্বেও সরকার গঠনের প্রশ্ন তিনি যে ভাবে টিভিকে-র উপর চাপ সৃষ্টি করেছেন, তাতে আগামী দিনে নির্বিঘ্নে সরকার এগিয়ে নিয়ে সহজ হবে না বিজয়ের পক্ষে। বিজয়কে এ বার বামেরা সমর্থন করেছেন। কিন্তু এই বামেরা এত বছর ডিএমকে-র জোটসঙ্গী ছিল। কংগ্রেসও তা-ই। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে, বিশেষত বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’য় পটপরিবর্তন হলে, তার প্রভাব তামিলভূমেও পড়তে বাধ্য। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতে সে রাজ্যেও রাজনৈতির অস্থিরতা বা বিধায়ক কেনাবেচার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতেই পারে।

    রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, বিরোধীরা চাপ সৃষ্টি করলেও, তা সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বিজয়ের। প্রথমত, রাজ্যে এই মুহূর্তে বিজয়কে নিয়ে এক রকমের আবেগ তৈরি হয়ে গিয়েছে। ফলে তাঁর সরকার ফেলার চেষ্টা হলেই জনতার দরবারে পৌঁছে যাবেন থালাপতি। সে ক্ষেত্রে যদি আবার নির্বাচন করানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়, সহানুভূতির ভোট কুড়োতে তাঁর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর যদি সেটা হয়, তা হলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ডিএমকে বা এডিএমকে-র। শপথ গ্রহণের পর ভাষণে বিজয় সাধারণ জনতার কাছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কিছু সময়ও চেয়েছেন। বলেছেন, তিনি রাজপরিবারের কেউ নন। ঈশ্বরের দূতও নন। সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, ‘আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারও সঙ্গে প্রতারণা করব না।’ থালাপতির ‘সততা’ই তাঁকে বৈতরণী পার করাবে বলেই মত অনেকের।

  • Link to this news (এই সময়)