সেটা ২০১৮ সাল। সঞ্জয় বালাকৃষ্ণ শাঠে নামে মহারাষ্ট্রের এক কৃষক ৭৫০ কিলোগ্রাম পেঁয়াজ বিক্রি করে হাতে পেয়েছিলেন ১০৬৪ টাকা। রাগে-দুঃখে পুরো টাকাটাই তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে। ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা করে নিন। আমার দরকার নেই।’ তার পরে আট বছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায়নি। মহারাষ্ট্রের সোলাপুর, নাসিকে ফের এক কিলোগ্রাম পেঁয়াজের পাইকারি দাম নেমে এসেছে ৫০ পয়সায়। মধ্যবিত্তের মুখে হাসি ফিরলেও পড়ে গিয়েছে কৃষকের।
গত শুক্রবার ক্ষেতের পেঁয়াজ বস্তায় ভরে সোলাপুরের শরিফ ট্রেডার্স নামে একটি আড়তে গিয়েছিলেন কৃষক অঙ্কুশ আন্না গুঞ্জাল। সোলাপুর জেলায় পাঙ্গেরে গ্রামে বাড়ি তাঁর। নিজস্ব জমি রয়েছে। সেখানেই পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। ফসলও ভালো হয়েছে। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে চোখে জল এসে যাওয়ার মতো অবস্থা। ৭২ বস্তা পেঁয়াজ তুলেছিলেন দাঁড়িপাল্লায়। কিন্তু কেজি প্রতি দাম ওঠে মাত্র ৫০ পয়সা।
সব পেঁয়াজ বিক্রি করে তিনি পান ৫,০৮৪ টাকা। কিন্তু গাড়ি ভাড়া, বস্তা তোলা-নামানো, আড়তের অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পরে অঙ্কুশের হাতে এসে ঠেকে মাত্র ৪০০ টাকা। রোদ, জলের মধ্যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাটাখাটুনির পরে এই ক’টা টাকা দেখে রীতিমতো ফুঁসছেন তিনি। একটি মারাঠি সংবাদমাধ্যমকে হাতের চারটি একশো টাকার নোট দেখিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বলিরাজার এই দশা।’ আসলে মহারাষ্ট্রে কৃষকদের সম্মান জানিয়ে পুরাণের দানবীর রাজা মহাবলির সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেই নিয়েই ব্যঙ্গ করেছেন অঙ্কুশ।
শুধু অঙ্কুশ নন। সোলাপুর, নাসিকের কৃষি উৎপাদন বাজার সমিতিতে গেলে এখন এই দৃশ্যই চোখে পড়বে। এক কুইন্টাল পেঁয়াজের দর দাঁড়িয়েছে ৫০ টাকা। কেন এই অবস্থা? বাজার অর্থনীতির সেই চিরাচরিত যুক্তিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। তাঁদের মতে, বাজারে পেঁয়াজের জোগান প্রচুর। কিন্তু চাহিদা নেই। কয়েক মাস আগে পর্যন্ত ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ রপ্তানি হতো পশ্চিম এশিয়ায়। কিন্তু যুদ্ধের জেরে সব বন্ধ। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল থমকে গিয়েছে। একটা, দুটো চলছে ঠিকই। কিন্তু কন্টেনারের ভাড়া আকাশছোঁয়া। ফলে বন্দরে পড়ে পড়ে পচছে। দেশের বাজারে সেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কিন্তু চাহিদা সেই হারে বাড়েনি। ফলে পাইকারি বাজারে দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা।
মরার উপরে খাঁড়ার ঘায় বসিয়েছে খারাপ আবহাওয়া। গ্রীষ্মের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ মজুতের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সময়টা জমিয়ে রেখে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন তাঁরা। একে বলে ‘গাড়োয়া’। কিন্তু এ বারে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। বিদর্ভের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এই গরমে পেঁয়াজের ভিতরের জলীয় অংশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ধরছে কালো ছত্রাক বা ব্ল্যাক মোল্ড। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অসময়ের বৃষ্টি। পেঁয়াজে একবার জল লাগলে তা আর সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে তাড়াহুড়োয় কম দামেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অনেকে মনে করছেন, মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ খুব শীঘ্রই বাংলার বাজারে ঢুকবে। এর ফলে মার খেতে পারেন এখানকার কৃষকরাও।