• ঔদ্ধত্য, স্বজনপোষণের জেরেই বারাবনিতে পতন সবুজ দুর্গের
    বর্তমান | ১১ মে ২০২৬
  • সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: সালটা ২০২১। সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক আবেগঘন পোস্ট করে চলেছেন তৎকালীন বারাবনির বিধায়ক বিধান উপাধ্যায়। সামনেই বিধানসভা ভোট। বারাবনিবাসীর উদ্দেশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা করছেন। কখনও বলছেন, ভুল যদি হয়েছে শুধরে নেব। আসুন কথা বলুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক বার্তা আর নাগাড়ে কর্মসূচি করে সে যাত্রায় গড় অটুট রেখে দিয়েছিলেন বিধান উপাধ্যায়। প্রায় ২৪ হাজার ভোট জয়লাভ করেন তিনি। এবার বিধানের কাছে মানুষের মনের সেই ক্ষোভ এসে পৌঁছয়নি। কিংবা পৌঁছলেও তিনি আঁচ করতে পারেননি। তাতে ফল যা হওয়ার তাই। শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে নিরাপদ তৃণমূলের আসনটিও হারাতে হয়েছে বিধানকে। 

    ভোটের অন্তত পাঁচ মাস আগে থেকেই আসন ধরে ধরে জয় ছিনিয়ে আনার লেখচিত্র এঁকেছিল বিজেপি। জয়ের সম্ভবনা কম থাকায় ‘ডি ক্যাটাগরি’র আসন ছিল বারাবনি। তা সত্ত্বেও ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের মন যাচাইয়ের কাজ শুরু করেন বিজেপির প্রবাসী বিস্তারকরা। তখনই উঠে আসে চমকপ্রদ তথ্য। শ্রদ্ধায় নয়, বারাবনির বহু সংখ্যক মানুষ শুধু মাত্র ভয়ে নীরব রয়েছেন। এই আভাস গেরুয়া শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে যেতেই কৌশল ঠিক হয়। বিজেপি স্লোগান তোলে, ভয়মুক্ত বাংলা গড়তে হবে। 

    কাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ? কাদের জন্য ভয়? কান পাতলেই ঩শোনা যায় বেশ কয়েকটি নাম। সালানাপুর ব্লকের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে গিয়েছিলেন বিধান উপাধ্যায়ের ভাই মুকুল উপাধ্যায়। ভোটের আগে মাধ্যমিক পরীক্ষা হচ্ছিল। সেখানে পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাতে বিশাল বিশাল ব্যানার দেওয়া হয়েছিল। তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধান উপাধ্যায়ের ছবির সাইজ ছোট। ব্যানারজুড়ে মুকুলের চওড়া হাসি মুখ। সালানপুরের মুকুল রাজ এমন পর্যায়ে গিয়েছিল, যেখানে ব্লক অফিস থেকে পঞ্চায়েত সব খানেই ছড়ি ঘোরাতেন তিনি ও তাঁর সঙ্গী ভোলা সিং। একই অভিযোগ রয়েছে বারাবনি ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অসিত সিংয়ের বিরুদ্ধেও। ভালো সংগঠক অসিত। কিন্তু তাঁর ভাইদের প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা মানুষ মেনে নিতে পারেনি। নেতাদের ঔদ্ধত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল লাগামছাড়া বেনিয়ম। খনি এলাকায় মানুষ স্বাধীন ভাবে ব্যবসা করতে পারত না। দাদাদের সন্তুষ্ট করতে পারলেই পরিবহণ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার অধিকার ছিল। লোকের জমি, সরকারি জমি, এমনকী অজয় নদের চরজুড়ে গজিয়ে উঠেছে অবৈধ পাথর খাদান, ক্র্যাশার। এছাড়া বিভিন্ন ফ্যাক্টরির ধুলোতে মানুষ সিলিকোসিসেও আক্রান্ত। মৃত্যু ঘটছে। তারপরই এলাকার প্রশাসকদের অবৈধ কারবারে লাগাম টানতে দেখা যায়নি। উল্টে তৃণমূল নেতার জন্মদিন পালন হয়েছে থানায়। মানুষ বিচারের অপেক্ষায় ছিল। ঘরের ছেলে বিধানকে নিয়ে ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই। কিন্তু তাঁর সেনাপতিদের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের আগুন ঝলসে দিয়েছে বিধানকে। তিনি পরাজিত হলেন ১১ হাজারেরও বেশি ভোটে। যদিও বিধান বলেন, ‘হেরে গেলে মানুষ অনেক ধরনের কথাই বলা হয়। ওরা মানুষের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করেছে।’ 

    প্রশ্ন হচ্ছে, বিজেপি কী তৃণমূল থেকে শিক্ষা নেবে? নাকি একই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবে? বারাবনির কয়লা বালি পাথর কারবারের ‘মায়া’ থেকে বেরিয়ে আসাই চ্যালেঞ্জ বিজেপির কাছে। দলের জেলা সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিজেপি সংগঠিত দল। তৃণমূলের ভুল কাউকে করতে দেওয়া হবে না।’
  • Link to this news (বর্তমান)