ভোট মিটলেও কাটেনি ‘ডিলিটেড’ তকমা তালিকায় নাম ফেরাতে হাহাকার
বর্তমান | ১১ মে ২০২৬
পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। ভোটের ফল বেরনোর পর কোথাও জয়ের উল্লাস, কোথাও আবার হারের বিষাদ। কিন্তু, এই জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে বীরভূমের কয়েক হাজার পরিবারে এখন শুধুই অন্ধকার। ভোট মিটলেও তাদের কপাল থেকে মোছেনি ‘ডিলিটেড’ বা ‘বাদ’ তকমা। এসআইআরের জাঁতাকলে পড়ে এবার গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হতে পারেনি জেলার প্রায় ৮২ হাজার মানুষ। নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজ্যজুড়ে চর্চা তুঙ্গে, তখন সিউড়ি থেকে ময়ূরেশ্বর, জেলায় জেলায় হাহাকার বাড়ছে একটাই প্রশ্নে, ‘এবার আমাদের নামটা তালিকায় উঠবে তো?’
বীরভূমের মুথাবেড়িয়ার দম্পতি শেখ গফ্ফর ও রোকেয়া বিবি এবার বুথমুখো হতে পারেননি। অথচ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ছিল। বংশপরম্পরায় এই জেলাতেই বসবাস। পেশায় দিনমজুর গফ্ফর সাহেব বলেন, কী কারণে আমাদের নাম বাদ গেল, আজও জানতে পারলাম না। আবার কবে নাম উঠবে তাও কেউ বলছে না। আমাদের মতো গরিব মানুষকে হয়রানি করে কার কী লাভ হচ্ছে?’ ওই দম্পতির মতো জেলার প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্য ‘বিচারাধীন’ হিসেবে ঝুলে ছিল। প্রশাসনিক নিষ্পত্তির পর দেখা গিয়েছে, জেলাজুড়ে প্রায় ৮২ হাজার মানুষের নাম পাকাপাকিভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। যাঁরা এবারের গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হতে পারেননি।
বাদ পড়াদের তালিকায় রয়েছেন ময়ূরেশ্বরের গৃহবধূ সাজেশ্বরী ভল্লাও। অন্যের বাড়িতে আয়ার কাজ করে সংসার চালান। সঙ্গে চার বছরের সন্তান। ভোটার তালিকায় নাম ফেরাতে রাতের ডিউটি সেরে ভোরবেলায় বাস ধরে ৪০কিলোমিটার পথ উজিয়ে সিউড়ি সদরে ট্রাইবুনালে আবেদন জানাতে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর ভাই সীতানাথ। ডান হাত অসাড়, বাম হাতের সাহায্যে কাজ করে সংসার টানেন সীতানাথও। সাজেশ্বরীর আক্ষেপ, আমাদের পূর্বপুরুষের জন্ম-মৃত্যু সব এখানে। তারপরও আমরা বাদ! ট্রাইবুনালে আবেদন করেছি, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। আর কোথায় যাব আমরা?
একই ছবি লোকপুরের সুমাই মুর্মু বা লালু কিস্কুদের ক্ষেত্রেও। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারকদের তত্ত্বাবধানে ‘বিচারাধীন’দের নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। জেলা প্রশাসন সূত্রের খবর, ৮২ হাজার মানুষ নাম ফেরানোর আশায় ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, এখনো পর্যন্ত মাত্র সাত-আটজনের নাম ফেরানোর কাজ নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি হাজার হাজার আবেদন পড়ে রয়েছে বিশবাঁও জলে।
ভোটের আবহে এই ‘বাতিল’ মানুষদের দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক প্রচারের আড়ালে। এখন সরকার বদলেছে। রাজনীতির রং পালটেছে। কিন্তু রোকেয়া, গফ্ফর কিংবা সাজেশ্বরীদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে লড়াইটা এখনও সেই এক তিমিরেই। তাঁদের কণ্ঠে এখন একটাই প্রশ্ন, ‘ভোট তো মিটল, আমাদের পরিচয় কি ফিরবে?’ এ প্রশ্নের উত্তর আপাতত খুঁজছে বীরভূমের ৮২ হাজার ‘ব্রাত্য’ মানুষ।