সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
বাংলা শাসন করতে গিয়ে দল ও সরকার গুলিয়ে ফেলা যাবে না, দু’টি বিষয়কে আলাদা করতে হবে — শনিবার বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথ অনুষ্ঠানে এসে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এমনই রূপরেখা দিয়েছেন বলে কেন্দ্রীয় বিজেপি সূত্রে খবর।
দলীয় সূত্রের দাবি, এই মর্মেই বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে গিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে দল সংক্রান্ত কোনও সমস্যা হলে যোগাযোগ করতে হবে বিজেপি–র সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের সঙ্গে৷ আর সরকার সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের রাত দিনের ‘হেল্প-লাইন’ হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে৷ শুধু দিল্লি থেকে পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত হবেন না, এই দুই শীর্ষ নেতাই অবরে–সবরে চলে আসবেন বাংলায় — এমনটাও জানা যাচ্ছে বিজেপি সূত্রে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, দল ও সরকার পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব থাকবে শমীক ভট্টাচার্য ও শুভেন্দু অধিকারীর উপরেই। শুধু এই দুই শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁদের ‘অভিভাবক’ হিসেবে কাজ করবেন।
দেশের আরও যে ২০টি রাজ্যে বিজেপি সরকার রয়েছে, প্রশ্ন উঠেছে, সেখানেও কি এই ভাবে দল ও সরকারের ‘অভিভাবক’ হিসেবে কাজ করেন নীতিন ও শাহ? কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্র আলাদা। প্রথমত, দেশের স্বাধীনতার পরে এই প্রথম ২৯৪টি আসনের রাজ্য বিধানসভায় ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে এখানে সরকার গঠন করতে পেরেছে বিজেপি। অন্য রাজ্যের কোথাও দুই–তিন–চার টার্ম চলছে। এখানে প্রথম। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, ক্ষমতার হাত বদলের পরে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তর থেকে বেনোজলের মতো বহু কর্মী–নেতা বিজেপি–তে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই তা আটকানোর বার্তা দিয়েছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি–র নাম করে গন্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করছেন তৃণমূলীরাই। এই অবস্থায় দল এবং সরকার দু’টি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন শীর্ষ নেতৃত্ব।
অন্য রাজ্যে যেখানে বাংলার মতো প্রথম বার সরকার গঠিত হয়েছিল, সেখানেও কি দিল্লি থেকে সরকার ও দলকে এ ভাবে নিরন্তর দেখভাল করা হয়েছিল? নেতাদের যুক্তি, এ ভাবে একেবারে নতুন আনকোরা সরকার সাম্প্রতিক অতীতে কোথাও আসেনি। দুই, এই রাজ্যের সংস্কৃতি, বাঙালির অস্মিতার ক্ষেত্রও আলাদা। বহু বিষয় নিয়ে বাঙালি সংবেদনশীল। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে লড়াই করা এক জিনিস ছিল৷ এখন রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিরোধী তৃণমূলের মোকাবিলা করতে হবে৷ তা সামলাতে হবে। ‘বিরোধী’ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। সরকার পরিচালনার সঙ্গে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে শুভেন্দুর নেতৃত্বাধীন সরকারকে। সে ক্ষেত্রেও শাহ–র মতো অভিজ্ঞ নেতার পরামর্শ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী৷ দিল্লির বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব সূত্রের খবর, কী ভাবে বাংলায় নতুন সরকার পরিচালনা করতে হবে, তার প্রাথমিক দিশা সেই অনুষ্ঠানে আসা–যাওয়ার পথে, মঞ্চে ও মঞ্চের বাইরে দেখিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে৷ নবগঠিত বিজেপি সরকারের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে আগামী এক বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জানেন প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী–সহ বিজেপির শীর্ষ স্তরের সব নেতাই৷ পাশাপাশি বাংলার মানুষের আশা–ভরসার মর্যাদা দিতে হবে পূর্ণমাত্রায়৷ এটা বিজেপির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ৷ এর উপরে ভিত্তি করেই তৈরি হবে আগামীর সোপান৷ এই আবহে বাংলায় ক্ষমতাসীন দল ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সূক্ষ্ম ‘লক্ষণরেখা’-র বিভাজন অবশ্যই প্রয়োজন, মনে করছে বিজেপির শীর্ষ স্তর৷ শুরুতেই এমন পদক্ষেপ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে বেনোজলের প্রভাবে সরকারের ভিত্তিটাই নড়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কাও থাকছে৷
এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতাদের সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের আরও একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে৷ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রথম সারির কেন্দ্রীয় বিজেপির এক নেতার যুক্তি, ‘আমাদের দলের পরিচালিত সরকার বাংলার জনতার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দিন–রাত কাজ করবে৷ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রেখে ডাবল ইঞ্জিনের গতিতে রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে৷ অন্যদিকে অন্যান্য রাজ্যের মতো বাংলাতেও আমাদের দল নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ মেনে কাজ করবে৷ রাজ্যের কোণায় কোণায় দলের ভিত আরও শক্ত করবে৷ দল ও সরকারের পরিচালন পদ্ধতির মধ্যে সীমারেখা টানা না হলে অদূর ভবিষ্যতে একটির চাপে দ্বিতীয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে৷ এত বছর ধরে লড়াই করে বাংলায় সরকার গঠনের পরে আমরা কখনই সেই ঝুঁকি নিতে পারি না৷’