এই সময়: গোটা দেশের মতো বাংলাতেও ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতিতেই চলতে চায় বিজেপি। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে তারা সঙ্গে জুড়ছে ‘সবকা হিসাব’–ও! নির্বাচনী প্রচারপর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে বারবার শোনা গিয়েছিল — ‘বিজেপি এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে সবকা সাথ, সবকা বিকাশের সঙ্গে তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের হিসেবও হবে।’ এ বার আইনি ভাবে সেই হিসেব বোঝার দিকে বিজেপির সরকার এগোতে চলেছে বলে রাজনৈতিক শিবিরের ধারণা।
বাংলার মসনদ এখন বিজেপির দখলে। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে শুভেন্দু অধিকারী। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর তিনি। সোমবারই নবান্নে বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে রাজ্যের ডিজি–সহ পুলিশের শীর্ষ কর্তারা হাজির থাকবেন। রবিবার ব্রিগেডে শুভেন্দু ছাড়াও মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু। তাঁদের সঙ্গে সোমবার দুপুরে নবান্নে বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তবে বিকেলে বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠক থেকে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী পুলিশকর্তাদের কী দিশা দেন, আপাতত সে দিকেই তাকিয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহল। তবে সামগ্রিক ভাবে পুলিশ এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি ফেরাতে তৃণমূল জমানার অনেক ফাইল যে খোলা হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি যে নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেছিল সেখানে এখনও জ্বলজ্বল করছে, ‘তৃণমূল জমানার গত ১৫ বছরের দুর্নীতি, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, আর্থিক অব্যবস্থা এবং আইন–শৃঙ্খলার অবক্ষয়ের খতিয়ান তুলে ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।’ অমিত শাহর মুখেও বহুবার শোনা গিয়েছে, ‘তৃণমূল জমানার সব দুর্নীতির তদন্ত হবে। তৃণমূলের যে দুষ্কৃতীরা বিজেপি কর্মীদের হত্যা করেছে, প্রয়োজনে তাদের পাতাল থেকে খুঁজে বার করা হবে। এবং কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই শুভেন্দু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কথা কম, কাজ বেশি’। অর্থাৎ, সরকারকে তিনি কী ভাবে চালাতে চান, সেটা মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। তাই সোমবারের বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠক থেকে তিনি যে আইন–শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিজেপির প্রতিশ্রুতি রক্ষার ‘কাজ’ শুরু করে দেবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গত ১৫ বছর তৃণমূল জমানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগের আঙুল উঠেছে। বিশেষেত, আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরে পুলিশ–প্রশাসনের ভাবমূর্তি কার্যত তলানিতে। সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা এই মুহূর্তে শুভেন্দুর সরকারের ‘প্রায়োরিটি’ তালিকার অন্যতম বলে বিজেপি সূত্রে খবর।
বিজেপির এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘তৃণমূল জমানায় রাজ্যের আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। রাজ্যে আইনের শাসন বলে কিছু ছিল না। মেয়েদের সুরক্ষাকেও প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ। বিজেপি সরকারের প্রথম লক্ষ্য পুলিশের উপরে মানুষের ভরসা ফেরানো।’ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)–ও চাইছে, আইন–শৃঙ্খলার প্রশ্নে ‘জ়িরো টলারেন্স’ অবস্থান নিক বাংলার বিজেপি সরকার। তাদের মতে, আইন–শৃঙ্খলার উন্নতি না হলে শিল্পপতিরা বাংলায় বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ভরসা পাবেন না। আর বিনিয়োগ না এলে পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্ব দূর হবে না। এক আরএসএস নেতার কথায়, ‘মোদীজি বারবার বলেছেন, ভয় আউট, ভরসা ইন। সেটা যে নিছক কথার কথা নয়, তা বাংলার বিজেপি সরকার করে দেখাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।’ দ্রুত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন বিজেপিরও অনেকে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরে শনিবার রাতে কাঁথির বাড়িতে ফেরার সময়ে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় কর্মী–সমর্থকদের উদ্দেশে বার্তা দেন শুভেন্দু। হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় দলীয় কর্মীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আইনি পথে যা করার করব। সব কথা বলছি না। আপনাদের ভরসা নষ্ট হতে দেবো না।’
সোমবার নবান্নের সভা ঘরে শুভেন্দুর ওই প্রশাসনিক বৈঠকের আগে রবিবার নবান্ন এবং সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা খতিয়ে দেখলেন কলকাতা ও হাওড়া পুলিশের শীর্ষকর্তারা। এ দিন বেলায় কলকাতার নগরপাল অজয় নন্দ, যুগ্ম নগরপাল ডিপি সিং, হাওড়ার পুলিশ কমিশনার অখিলেশ চতুর্বেদী–সহ পদস্থ পুলিশ আধিকারিকেরা নবান্ন পরিদর্শন করেন। তার পরে পুলিশকর্তারা নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে রিভিউ বৈঠকও করেন। কমিশনার অজয় নন্দ বলেন, ‘আগে থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল। তার পরেও আমরা এ দিন রিভিউ করে দেখলাম কোথাও কোনও বাড়তি বন্দোবস্তের প্রয়োজন রয়েছে কি না। সোমবার পুলিশের সঙ্গে বিকেল পাঁচটায় মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা। তার পরে যদি কিছু আমাদের তরফ থেকে বলার থাকে, জানাব।’ আজ বৈঠকে মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা, স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ ছাড়াও হাজির থাকবেন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা ও অজয় নন্দ।