• আমারও তো পদোন্নতি হয়নি, সমস্যা বলার কোনও জায়গাই ছিল না! হঠাৎ কর্পোরেট হয়ে গেল: অনন্যা
    আনন্দবাজার | ১১ মে ২০২৬
  • বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিয়মিত প্রচার করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে। নির্বাচনের এমন ফলাফল প্রত্যাশা করেননি। তবে প্রচারে গিয়ে আন্দাজ করেছিলেন, ক্রমশ মানুষ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছেন, জানালেন অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের অন্দরে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, স্বীকার করেন তিনি। কিন্তু তা প্রকাশ্যে বলার মতো কোনও জায়গা ছিল না।

    ফলাফল নিয়ে অনন্যার বক্তব্য. এর নেপথ্যে নানা কারণ রয়েছে। নানা ঘটনা রয়েছে। অনন্যার কথায়, “মানুষ এই পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। জনাদেশ অস্বীকার করার জায়গা নেই। অনেকেই ইভিএম কারচুপির কথা বলছেন ঠিকই। কিন্তু আমি তো জানি না। সবই প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু মানুষ রায় দিয়েছে, তাই এই পরিবর্তন।”

    অনন্যা কলকাতা পুরসভার মুকুন্দপুর অঞ্চলের পুরপ্রতিনিধি। ফলপ্রকাশের পরে তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা অন্য সুরে কথা বলছেন। তাঁর কথায়, “ফল প্রকাশের পরে নানা মানুষ দলের অন্দরের সমস্যার কথা বলছেন। কেউ কেউ রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলছেন। এই শুনে কিছু মানুষ মনে করছেন, ক্ষমতার লোভে তাঁরা এখন পুরনো দলকে ভুলে নতুন দিকে ঝুঁকতে চাইছেন। কিন্তু এতটা সরলীকরণ করে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, দলের অন্দরের সমস্যা বলার মতো জায়গাই ছিল না।”

    অনন্যা নিজেও সমস্যার কথা বলেছেন। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ভাল কাজ করার পরেও তাঁর পদোন্নতি হয়নি, এ কথাও উঠে আসে তাঁর মুখে। অভিনেত্রীর বক্তব্য, “দল নিয়ে কেউ কেউ গঠনমূলক সমালোচনা করছেন। এমন নয়, তাঁরা দল থেকে বেরিয়ে দায়মুক্ত হতে চাইছেন। আমি এখন বললেও হয়তো তা নিয়ে সরলীকরণ হবে। দল ক্ষমতায় থাকাকালীন বলা হয়নি কেন? এই প্রশ্নটাও যুক্তিসঙ্গত।” অনন্যা নিজেও কি কোনও সমস্যার মুখে পড়েছেন? কোনও ক্ষোভ রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি ২০১৫ থেকে ২০২৬ অর্থাৎ এখনও কলকাতা পুরসভার ১০৯ ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছি। আমি তো দলের জন্য কাজ করে গিয়েছি। কিন্তু আমি তো সেই পুরপ্রতিনিধি হয়েই আছি। কোনও পদোন্নতি তো হয়নি। আমার মূল্যায়নও তো দল করেনি। ক্ষোভ-বিক্ষোভের জায়গা তো অনেক বেশি। বলার অনেক জায়গা ছিল। দুঃসময়ে কথাগুলো বলতে চাই না, তাই এত দিন বলিনি। আর দল ক্ষমতায় থাকাকালীন এ সব শোনার কেউ ছিল না। তাই যাঁরা এখন মুখ খুলছেন, তাঁরা শুধুই অন্য দলে যাওয়ার জন্য বলছেন, এমনটা নয়। বলার পরিবেশই ছিল না।”

    দলের এই পরিবেশ তৈরি হল কী ভাবে? কেন মানুষ আস্থা হারালেন? অনন্যার স্পষ্ট উত্তর, “যে সমস্যাগুলোর কথা সকলে বলছেন, সেগুলোই এই পরিণতির কারণ। তৃণমূল তো ‘মা, মাটি, মানুষের’ দল। মাটিতে পা রেখে মাটির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করার কথা। সংগঠনের শেষ মানুষটার সঙ্গেও যোগাযোগ থাকতে হবে। সেই জায়গায় হঠাৎ দলটা কর্পোরেট হয়ে গেল। এজেন্সি-নির্ভর একটি দল হয়ে গেল। এজেন্সিই নীতি নির্ধারক হয়ে গেলে সমস্যা হবেই।”

    তৃণমূলের ভোট প্রচারে লুডোর বোর্ড বিলি করা হয়েছিল। সেই ঘটনার সরাসরি সমালোচনা করে অনন্যা বলেন, “আইপ্যাক সবাইকে লুডো দিচ্ছিল। কেন দিচ্ছিল? মানুষকে পরোক্ষ ভাবে বলা হল, ‘তোমাদের ভবিষ্যতে আর কিছু হবে না, তোমরা লুডো খেলো’। আমি আজও জানি না, কেন দেওয়া হল। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। নির্দেশ মানতেই হবে! মানুষ কিন্তু লুডো খেলেছে। সাপের মুখে ফেলে নীচে নামিয়ে দিয়েছে।”

    কিন্তু এই ফল কি সত্যিই আশা করেছিলেন তৃণমূল নেতৃত্ব? অনন্যা জানান, তিনি ভেবেছিলেন, এ বার হয়তো বিজেপির বেশ কিছু আসন সংখ্যা বাড়বে। মানুষের সঙ্গে কথা বলেও আন্দাজ করেছিলেন পরিবর্তন চাইছেন তাঁরা। তার পরেই পাল্টা প্রশ্ন অনন্যার, “কিন্তু এই পরিবর্তনই কি মানুষ চেয়েছিলেন? আমার এলাকায় সব পার্টি অফিসের রং বদলে গিয়েছে, না হলে তালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিজেপির পতাকা লাগিয়ে। ফল বেরোনোর পরে প্রথম কয়েক দিন মত্ত হয়েছিল মানুষ। আমি আমার এলাকার পুরনো বিজেপি নেতাদের অনুরোধ করে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার অনুরোধ করি। তাই আমার প্রশ্ন, এটাই কি পরিবর্তন? অবশ্য অনেকেই বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমশ ঠিক হবে। এ বার দেখা যাক।”

    অরূপ বিশ্বাসের হয়ে নির্বাচনে আগেও প্রচার করেছেন অনন্যা। টালিগঞ্জে বরাবর জয়ী হয়ে আসছেন অরূপ। সেখানে এ বার জয়ী পাপিয়া অধিকারী। এই ফলাফল প্রথমে কিছুটা অবাক করেছিল অনন্যাকে। তাঁর কথায়, “অরূপ বিশ্বাসের পরাজয় বিশ্বাসযোগ্যই নয়। তিনি খুবই ভাল সংগঠক। ওঁর সঙ্গে কথাও হয়েছে। তিনিও বললেন, এ বার প্রার্থী দেখে ভোট হয়নি। এ বার দল দেখে মানুষ ভোট দিয়েছে।” রাজনীতির পাশাপাশি অভিনয় করেন অনন্যা। এত দিন চলা ‘ব্যান কালচার’ উঠে যাওয়ার কথা শুনে অনন্যার বক্তব্য, “এমন হলে সবারই ভাল হবে। সব দলের মানুষই উপকৃত হবে। তবে এখন তো সবই মুখের কথা। সেগুলো কাজে করে দেখানো হবে কি না, সেটাই দেখার।”

    ২০১৯ সাল থেকেই বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে অনন্যার কাছে। “ভাল কাজ করেছি। ভাল কাজ করার চেষ্টা করে গিয়েছি। সে জায়গা থেকে প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু আমি দলের জন্য করতে চেয়েছি। আর এখন এই নিয়ে ভাবতে গেলে তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। আগে নিজের দলে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যদিও সেই নিয়েও কেউ উদ্যোগী হননি এখনও।” এ সব দেখে ভবিষ্যতে আদৌ রাজনীতি চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়েও ধন্দে রয়েছেন অনন্যা।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)