• এক বছর সোনা না কেনার আর্জি, কেন এই পথে হাঁটার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর?
    এই সময় | ১১ মে ২০২৬
  • পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখতে দেশবাসীর কাছে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এড়াতে, পেট্রল ও ডিজ়েলের ব্যবহার কমাতে এবং এক বছরের জন্য সোনা কেনা স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

    ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা আমদানিকারক দেশ। দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনার চাহিদা থাকে। অথচ দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন হয় মাত্র ১ থেকে ২ টন। অর্থাৎ মোট চাহিদার ৯০ শতাংশেরও বেশি সোনা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

    সোনা আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার খরচ হয়। ফলে দেশের আমদানি বিল বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হয়। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সোনা ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে মূল্যবান হলেও শিল্প উৎপাদন বা রপ্তানিতে এর অবদান খুব সীমিত।

    সোনা আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার খরচ হয়। ফলে দেশের আমদানি বিল বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হয়। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সোনা ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে মূল্যবান হলেও শিল্প উৎপাদন বা রপ্তানিতে এর অবদান খুব সীমিত।

    ভারতে সোনা আমদানির উপর প্রায় ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক কার্যকর রয়েছে। তবুও চাহিদা বেশি থাকায় সোনা আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়।

    পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ভারত তার মোট তেলের চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে দেশের ডলার খরচও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সার, পরিবহণ এবং অন্যান্য আমদানি খরচও বাড়তে পারে।

    এই পরিস্থিতিতে সোনা, বিদেশ ভ্রমণ বা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খাতে ডলার ব্যয় কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী এক বছরের জন্য সোনা কেনা পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

    ভারতে সোনা শুধু বিনিয়োগ নয়, সামাজিক আবেগের অংশ। বিয়ে, উৎসব এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সোনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে সামগ্রিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে অতিরিক্ত সোনা আমদানি উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি না করেই ডলারের আউটফ্লো বাড়ায়।

    প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের সময়েই দেখা যাচ্ছে, দেশে সোনা আমদানি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ১০০ টন সোনা আমদানি হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৬৫-৬৬ টনে নেমে আসে। মার্চে তা আরও কমে ২০-২২ টনে দাঁড়ায়।

    এপ্রিল মাসে সোনা আমদানির পরিমাণ ১৫ টনের আশপাশে। কোভিড পর্ব বাদ দিলে এটি গত প্রায় তিন দশকের অন্যতম নিম্নতম মাসিক আমদানি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার উচ্চ দাম এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় কিছু বিঘ্ন— এই দুই কারণেই আমদানি কমেছে।

    প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে দেশের ফরেক্স রিজ়ার্ভ ছিল ৬৯,১১১ কোটি ডলার। এটি প্রায় ১১ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট। তবে ১ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে এই রিজ়ার্ভ ৬৯,০৬৯.৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ রিজ়ার্ভ শক্তিশালী হলেও আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার কারণে সতর্ক থাকাটাও খুব প্রয়োজন।

    রিজ়ার্ভে সোনার পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চের শেষে ভারতের ফরেক্স রিজ়ার্ভে সোনার অংশ দাঁড়িয়েছে ১৬.৭ শতাংশে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই অঙ্ক ছিল ১৩.৯২ শতাংশ।

    মার্চের শেষে ভারতে সরকারি মজুত ছিল মোট ৮৮০.৫২ মেট্রিক টন সোনা। এর মধ্যে ৬৮০.০৫ মেট্রিক টন সোনা দেশে সংরক্ষিত রয়েছে। গত কয়েক বছরে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক বিদেশে রাখা সোনার একটি বড় অংশ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।

    প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন কোনও বাধ্যতামূলক নির্দেশ নয়। এটি একটি সতর্কতামূলক আহ্বান। যাঁদের জরুরি প্রয়োজনে সোনা কিনতেই হবে, তাঁরা তা কিনতেই পারেন। তবে বিনিয়োগ বা বিলাসবহুল কেনাকাটার ক্ষেত্রে কিছুটা অপেক্ষা করলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সহায়ক হতে পারে।

    সরকারের মূল বার্তা হলো, ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্তও জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা কমালে আমদানি বিল কমতে পারে। যার ফলে ডলারের উপর চাপ হালকা হতে পারে এবং দেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল থাকতে পারে।

  • Link to this news (এই সময়)