উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন চন্দনা বাউরি (Chandana Bauri)। হাতে চিরুনি। সকালের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে চুলের জট ছাড়াচ্ছেন। পাশে একটা খাটিয়া পাতা। তার একটা পায়া একটু ছোট, নড়বড় করছে। তাকে ঘিরে গুটিকতক চেয়ার। তিনি যে বাঁকুড়ার শালতোড়ার নতুন বিধায়ক, দেখে বোঝার জো নেই। সেমবারের সকালে গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের কেলাই গ্রামে চন্দনার বাড়িতে এক এক করে ভিড় জমাচ্ছেন বিজেপি কর্মীরা। রয়েছেন কয়েক জন স্থানীয় গ্রামবাসীও।
চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতেই টুকটাক কথা চলছে। পাশ থেকে কে একজন বলে উঠলেন, ‘দিদি ওই রাস্তাটা...’। কথা শেষ হওয়ার আগেই ধরে নিলেন চন্দনা, ‘হ্যাঁ, ওটা এ বারে করতেই হবে।’ চিরুনিটা খাটিয়ার উপরে রেখে নিজেও বসে পড়লেন। বাড়ির সামনে লাল মাটির রাস্তা। দুটো গোরু চড়ছে। চন্দনা এক ঝলকে দেখে নিলেন সব। পুরোনো কথা মনে পড়ল কী? অবশ্য তিনি এখনও ‘পুরোনোই’ রয়েছেন। বদলাননি একটুও।
আজ চন্দনার একটু তাড়া রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নতুন বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করবেন। নবান্নে যেতে হবে। উঠোনে বসে থাকা কর্মী আর গ্রামবাসীদের সেই কথা জানিয়ে উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন গেলেন চন্দনা। তাঁর পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি আর লাল ব্লাউজ। গালে, কপালে জলের ফোঁটা। আঁচল দিয়ে গলাটা একবার মুছে নিয়ে বললেন, ‘অনেক কাজ বাকি। তৃণমূল শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিছুই করেনি।’
কথা বলতে বলতেই গ্যাস জ্বাললেন। কাপে মাপ নিয়ে জল ঢেলে দিলেন সসপ্যানে। তার পরে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি জল পৌঁছে দেব আমরা। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন সবার আগে।’ পরিযায়ী শ্রমিকদের আবার নিজের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনা তাঁর স্বপ্ন। স্বামী শ্রবণ বাউরি রাজমিস্ত্রী। নিজেও জোগাড়ের কাজ করেছেন। এখনও হাত লাগান মাঝে মধ্যে। তিনি জানেন, কত লোক কাজের আশায় নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে ভিন রাজ্য পাড়ি দিয়েছে। কাপের উপরে ছাঁকনি রেখে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘পাথর খাদানগুলো আবার চালু করতে হবে। তা হলে অনেকটা সুরাহা হবে। লোকজন আবার গ্রামে ফিরবে।’
বিধায়ক হওয়ার পরে কিছু বদলেছে? প্রশ্নটা শুনেই হেসে ফেললেন চন্দনা, ‘জীবন জীবনের মতো চলবে। আমরা মেয়ে। সকালে উঠে ঘরের সব কাজ করা আমাদের অভ্যাস। এটা আর নতুন কী?’ তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ তিনি আগেও করেছেন। এ বারে রীতিমতো গর্জন। ছোটখাটো শরীরটা যেন কেঁপে উঠল। তর্জনী উঁচিয়ে বললেন, ‘আপনারা তো জানেন, তৃণমূল আমাদের কর্মীদের খুনও করেছে। কিন্তু তার পরেও আমরা দমে যাইনি। সাইকেল নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরেছি। লোককে বুঝিয়েছি, অত্যাচার হলে প্রতিবাদ করতে হবে।’ চন্দনার প্রচারে কাজ হয়েছে। রাজ্য জুড়ে ফুটেছে পদ্মফুল।
চন্দনা কবীর সুমনের নাম শুনেছেন কি না, বলা মুশকিল। তবে মন্ত্রীত্বের কথা শুনেই যে ভাবে আঁতকে উঠলেন, যেন বলতে চাইলেন, অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনও দাবিদাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু কাজ করে যাওয়া। শালতোড়ার দু’বারের বিধায়কের কথায়, ‘পার্টি আমায় অনেক দিয়েছে। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এই সব পাব। তাই ওই সব ভাবছি না। যেন এলাকার উন্নয়ন করে যেতে পারি। এটাই চাইব।’ রান্নাঘরের সামনে একটা বালতিতে কয়েকটা জলের বোতল রাখা ছিল। কথা শেষ করে বোতলগুলো তুলে নিলেন। জল ভরতে হবে। তার পরেই নাকে-মুখে ক’টা ভাত গুঁজে ছুটতে হবে কলকাতায়। কাজ, কাজ। এই তো জীবন কালীদা।