• ‘যানজটেই অর্ধেক জীবন শেষ’, মোদীর ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোমের’ বার্তাকে দু’হাত তুলে সমর্থন নিত্যযাত্রীদের
    এই সময় | ১২ মে ২০২৬
  • বাসে বসে দড়দড় করে ঘামছেন এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি। কাঁধে ব্যাগ, হাতে বাজারের থলি। অফিস থেকে ফিরছেন। টুকটাক বাজার করেছেন। কিন্তু এসএসকেএম হাসপাতালের সামনে লম্বা যানজট। একেবারে নট নড়নচড়ন অবস্থা। রুমাল দিয়ে ঘাড়-গলা মুছতে মুছতে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘জ্যামে বসে থাকতে থাকতেই অর্ধেক জীবনটা কেট গেল, ধুর।’ চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি। সঙ্গে সঙ্গে পিছনের সিট থেকে একজন বলে উঠলেন, ‘দাদা, প্রধানমন্ত্রী তো আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালুর কথা বলছেন।’ কথাটা শুনেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ওই মধ্যবয়সী ব্যক্তি। তার পরে একটা ফিচেল হেসে নীচু স্বরে বললেন, ‘কথাটা বসের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে কি?’

    পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কটে জ্বালানি বাঁচাতে যেখানে সম্ভব ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত রবিবার তেলেঙ্গানার একটি সভা থেকে পেট্রল, ডিজ়েল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেল ব্যবহারে রাশ টানার পাশাপাশি আগামী এক বছর বিদেশ ভ্রমণ এবং সোনা কেনা বন্ধ রাখার কথাও শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে। জ্বালানি বাঁচাতেই স্কুল-কলেজ, অফিস-কাছারিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু উপরেও জোর দিয়েছেন তিনি। তার পর থেকেই মাঠেঘাটে, চায়ের দোকানে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। অনেকেরই প্রশ্ন, বাড়ি থেকেই যদি ঠিকঠাক কাজ করা যায়, তা হলে প্রতিদিন অফিস যাওয়ার দরকারটা কী?

    প্রশ্নটা অমূলক নয়। অফিসে যাওয়ার জন্য একটা প্রস্তুতি লাগে। অন্তত দু’ঘণ্টা আগে থেকে তৈরি হতে হয়। স্নান-খাওয়া, জামাকাপড় পরা - যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু নয়। বাড়ির কাছেই অফিস হলে আলাদা কথা, কিন্তু সবাই তো আর সৌভাগ্যবান নয়। অনেককেই একঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা বাস ঠেঙিয়ে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছতে হয়। কাউকে আরও বেশি। আর রাস্তায় বেরলেই যানজট। সেখানেও সময় নষ্ট।

    ট্র্যাফিকের পরিস্থিতি যে দুঃসহ, সেই কথা নিত্যযাত্রী মাত্রই জানেন। প্রতি বছর এই নিয়ে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে টমটম ট্র্যাফিক ইনডেক্স। তাতে দেখা যাচ্ছে, কলকাতায় মাত্র ৪.৩ কিলোমিটার রাস্তা পেরতে গড়ে ১৫ মিনিট সময় লাগে। ভাবা যায়! এই জেট যুগে যেন গোরুর গাড়ির মিছিল চলছে। বছরের হিসেব করলে, যানজটেই কেটে যায় ৬টা কর্মদিবস। বাসে, ট্রামে নষ্ট ১৫০ ঘণ্টা। বেঙ্গালুরুর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে বছরে নষ্ট নয় ১৬৮ ঘণ্টা। শুধু কলকাতা বা বেঙ্গালুরু নয়, সব মেট্রো শহরগুলোরই কমবেশি একই অবস্থা।

    তাই প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালুর কথা বলতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আনন্দের জোয়ার উঠেছে। অনেকেই দু’হাত তুলে সমর্থন করছেন তাঁকে। জ্বালানি সাশ্রয়ের ভাবনা আর যানজটের কষ্ট সব মিলেমিশে একাকার। মেঘা নামে এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী যেমন X হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কথা বলেছেন শুনে খুব ভালো লাগল। ভারতে প্রতিদিন যানজট, জ্বালানি আর মানসিক চাপ সইতে সইতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। আসলে সময় নষ্ট হয়।’ তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘বাড়ি থেকে সব কাজ যদি ঠিকঠাক সামলানো যায়, তা হলে সময়ের সঙ্গে এই বদল আনতে সমস্যা কোথায়?’

    সময়ের সঙ্গে বদলানোটাই হলো আসল কথা। মা-ঠাকুমারা বলতেন, ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’ এটাও সেই রকম। প্রধানমন্ত্রী সঙ্কটকালের কথা বললেও মেঘার মতো অনেকে এটাকেই পাকাপাকি ব্যবস্থা বানাতে চাইছেন। তাঁর পোস্টে রীতিমতো আড্ডা শুরু হয়ে গিয়েছে। হাইব্রিড বা রিমোট ওয়ার্ক যে আগামী দিনে বড় শহরগুলিতে সুস্থ-স্বাভাবিক ভাবে টিকে থাকার অন্যতম রসদ হয়ে উঠতে চলেছে, সেই বিষয়ে অনেকেই একমত। এখন প্রশ্ন হলো, ওয়ার্ক ফ্রম হোম আদৌ চালু হবে? হলে কবে?

  • Link to this news (এই সময়)