কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
কোনও রকমে দাঁড়িয়ে একটা দেওয়াল, গোটা কয়েক থাম আর খিলান। আগাছায় ঢাকা ২৮৫ বছরের পুরোনো ওই দেওয়াল নিয়ে কাটোয়ার দাঁইহাটের বাসিন্দাদের চর্চার শেষ নেই। শোনা যায়, বাংলায় বর্গি আক্রমণের সময়ে ১৭৪২–এ এখানে মন্দির গড়ে দুর্গাপুজো করেছিলেন বর্গি সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত। বর্গি আক্রমণের এই একটি নিদর্শনই এখনও পর্যন্ত টিকে, সংরক্ষণের অভাবে বিপর্যস্ত।
কাটোয়া থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের তেলকুপিতে দামোদরের তীরে কোনও রকমে দাঁড়িয়ে একটি মন্দির। প্রতি বর্ষায় ওই দেউল চলে যায় দামোদরের গর্ভে। শুধু জেগে থাকে চূড়ার অংশ। খ্রিস্টীয় নবম–দশম শতকে তৈরি এই জৈন মন্দিরের দিন যে ঘনিয়ে এসেছে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। পাথরের স্ল্যাব খুলে এসেছে। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, কাছাকাছি বিভিন্ন গ্রামে একটু ঘোরাঘুরি করলেই পাওয়া যায় জৈন মূর্তি।
কিন্তু এ সব রক্ষণাবেক্ষণের ভারপ্রাপ্ত রাজ্যের প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহালয় অধিকার এবং রাজ্য হেরিটেজ কমিশনই তো বিপন্ন! গত ১৫ বছরে সরকারি এই দুই বিভাগ কোনও কাজই প্রায় করেনি বলে অভিযোগ প্রত্নতত্ত্ববিদদের। প্রাচীন সামগ্রী ও সৌধ চিহ্নিত করা বা সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্ববিদ দরকার, কিন্তু সরকারি বিভাগে তাঁদের সংখ্যা তলানিতে। বিভাগ চলছে ডব্লিউবিসিএস অফিসারের নির্দেশে। যাঁরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণে অনভিজ্ঞ। অর্থের জোগান না–থাকা এবং প্রত্নতত্ত্ববিদের অভাবে ধ্বংসের প্রাচীন বাংলার বহু ঐতিহ্যশালী সম্পদ। রাজ্যে পালাবদলের পরে ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের মানসিকতায় বদল চাইছেন বিশেষজ্ঞরা।
মোগলমারি, জগজীবনপুর এবং দেউলপোতার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্রে সংরক্ষণের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে বর্ষীয়ান প্রত্নতত্ত্ববিদ প্রকাশচন্দ্র মাইতির। রাজ্যের 'প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহালয় অধিকার' এবং রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের দুর্দশা নিয়ে তাঁর মন্তব্য, 'আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া রাজ্যের বিভিন্ন সৌধকে 'হেরিটেজ' চিহ্নিত করেছে। কিন্তু এর বাইরে সব জেলায় বহু প্রাচীন দেউল, ভগ্নপ্রায় মহল রয়েছে, েসগুলির সংরক্ষণ প্রয়োজন।' কোথাও কোথাও কখনও পুকুর কাটার সময়ে বা বাড়ির ভিত খুঁড়তে গিয়ে প্রাচীন আমলের মূর্তি উদ্ধার হয়। থানায় খবর গেলে পুলিশ এসে মূর্তি নিয়ে যায়। কিন্তু তার পরে মূর্তিগুলি শনাক্ত করা হয় কি না, কোথায় রাখা হয়—পুরোটাই ধোঁয়াটে বলে জানাচ্ছেন প্রকাশ।
পেশায় চিকিৎসক, নেশায় কলকাতার স্থানীয় ইতিহাসে আগ্রহী দেবাশিস বসু ঐতিহ্য ও পুরাতাত্ত্বিক সামগ্রীর প্রতি সীমাহীন অবহেলায় ক্ষুব্ধ। তাঁর বক্তব্য, 'যে ভাবে শহরে নিয়মিত একের পর এক পুরোনো এবং ঐতিহ্যশালী বাড়ি ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তা অমার্জনীয় অপরাধ। শহরেই এই অবস্থা। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা অনুমেয়। উপযুক্ত–সংখ্যক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে দপ্তরের পুনর্গঠন না করলে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলা তার বিপুল সম্পদ হারাবে।'
প্রকাশ জানিয়েছেন, এক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সংগ্রহালয় তৈরি হয়েছিল। সেগুলি সব প্রায় বন্ধ কিউরেটরের অভাবে। রাজ্য সরকার বেসরকারি যে সংগ্রহালয়গুলিকে এক সময়ে আর্থিক সাহায্য করত, সেই সাহায্যও বন্ধ ২০১১ থেকে। এ বার সরকারি মনোভাব বদলাক, চাইছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষায় 'বেঙ্গল আর্কিয়োলজিক্যাল সোসাইটি' নামে সংগঠন তৈরি হয়েছে। তারা বিভিন্ন জেলায় সংরক্ষণযোগ্য সৌধ চিহ্নিত করা এবং স্থানীয় মানুষদের কাছে সেগুলির গুরুত্ব তুলে ধরার কাজ শুরু করেছে। তবে দরকার সরকারি উদ্যোগের।