এই সময়: বাংলায় বিজেপির নতুন সরকার গঠনের পরে সোমবার প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অরক্ষিত অংশে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া দিতে বিএসএফের হাতে প্রয়োজনীয় জমি দ্রুত হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যেই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হতে জমি তুলে দেওয়া হবে। নতুন সরকারের এই ঘোষণায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে এতদিন যে অনুপ্রবেশ ও পাচারের যে রমরমা কারবার চলছিল, পাশাপাশি চলছিল গবাদি পশু ফসল লুট, তাতে এবার রাশ টানা যাবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
মালদা
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিএসএফের হাতে জমি তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণার পরে হবিবপুরের সীমান্ত এলাকা ধূমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের জোতকুবের গ্রামে চাঁদা তুলে বজরংবলীর পুজোর আয়োজন করা হয়। সীমান্তের বাসিন্দাদের বক্তব্য, এতদিন এলাকার খোলা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা এখানে ঢুকে ফসল লুঠ করত। গোরু, ছাগল চুরি করে নিয়ে যেত। কিন্তু এবারে থ্রি ফেজের কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা পড়বে সীমান্ত। ফলে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম বন্ধ হবে। বিএসএফ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মালদা জেলায় ছয়টি থানার প্রায় ১৭৩ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় সীমান্তে নদীপথ রয়েছে। গত বছর বৈষ্ণবনগর থানার শুকদেবপুর এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াকে ঘিরে বিএসএফ এবং বিজিবি'র মধ্যে চরম সংঘাত তৈরি হয়। যদিও পরে তা মিটে যায়। হবিবপুর থানার ধূমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের জোতকুবের এলাকার বাসিন্দা পারস চৌধুরী, কমল বাস্কে বলেন, 'সীমান্তবর্তী এলাকায় আমাদের জমি রয়েছে। সেই জমি আমরা বেড়ার জন্য সরকারকে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণের কোনও আগ্রহ দেখানো হয়নি। কিন্তু এবারে নতুন সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।'
দক্ষিণ দিনাজপুর
জেলার তিনদিক জুড়েই রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত। প্রায় ২৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের মধ্যে এখনও প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতার নেই। যার মধ্যে হিলিতেই সব থেকে অরক্ষিত সীমান্ত আছে। খোলা সীমান্তের এলাকাকে পাচারকারী ও অনুপ্রবেশকারীরা সফট টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করতেন। এ বিষয়ে সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দা জয়া কর্মকার ও টুম্পা লোহার বলেন, 'কাঁটাতার না থাকার সময় খুব সমস্যা হতো। সুযোগ পেলেই ওপার থেকে আমাদের উপর অত্যাচার চালানো হতো। সন্ধ্যার পর সীমান্তে গোরু-ছাগল কোনওটাই রাখা যেত না। এখন সীমান্তে কাঁটাতার হলে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে পারব।'
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ঘেরা কোচবিহার জেলা। কোচবিহারে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। তার মধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মিলে প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকায় কোনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। অনুপ্রবেশ নিয়ে এখানে বারে বারেই অভিযোগ উঠেছে। চোরাচালানকারীরাও বেশ সক্রিয়। এমনকী, বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে এখানকার মানুষদের তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অন্যান্য জায়গার মতো সোমবার রাজ্যের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সীমান্ত এলাকায় জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন এই জেলার সীমান্তপাড়ের বাসিন্দারাও। মেখলিগঞ্জের সীমান্তের নিচতরফ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, 'কাঁটাতারের বেড়া হলে খুবই ভালো হবে। চোরাচালান বন্ধ হবে। পাশাপাশি আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা কমবে।' আর এক বাসিন্দা বাবলা রহমান বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে আমরা এখানে কাঁটাতারের বেড়ার দাবি জানিয়ে এসেছি। এখন সেটা দ্রুত পূরণ হবে, তাতে আমাদেই মঙ্গল।' বাগডোগরা ফুলকাডাবরির বাসিন্দা অনুপ রায় বলেন, 'উন্মুক্ত সীমান্ত হওয়ায় বাংলাদেশিরা আমাদের ভূখন্ডে ঢুকে অত্যাচার করত। এদিনের মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর আমরা নিশ্চিন্ত। কুচলিবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা সম্রাট নাথ বলেন, 'এবার সীমান্ত পাড়ের বাসিন্দারা শান্তিতে থাকতে পারবেন।'
শিলিগুড়ি
শিলিগুড়ি মহকুমার মধ্যে ফাঁসিদেওয়ায় বেশ কয়েক কিলোমিটার সীমান্ত উন্মুক্ত রয়েছে। সেখান থেকে অনুপ্রবেশ, চোরাচালানের ঘটনা ঘটে। এখন কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলে অন্য সীমান্তের বাসিন্দাদের মতো এই সীমান্তের মানুষজনও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। ফাঁসিদেওয়ার বাসিন্দা যুগল সিংহ বলেন, 'মাঝেমধ্যেই আমদের অনুপ্রবেশের সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া গেলে তা আমাদের জন্য ভালোই হবে।" শিলিগুড়ি মহাকুমা পরিষদের বিরোধী দলনেতা বিজেপির অজয় ওরাও বলেন, 'এতদিন জমির অভাবে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে ছেলেখেলা করা হচ্ছিল। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পরেই দ্রুত। বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরফলে আর প্রতিবেশী দেশ থেকে অনুপ্রবেশ করতে পারবে না কেউ। এটা খুব প্রয়োজন ছিল।'
জলপাইগুড়ি
জলপাইগুড়ি জেলার সদর ব্লকে নগর বেরুবাড়ি, পশ্চিম বেরুবাড়ি গ্রামপঞ্চায়েতের বাংলাদেশ সীমান্তে এখন প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতার নেই। অভিযোগ, এই সমস্ত এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশ যেমন ঘটে, তেমনি বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা গ্রামে ঢুকে গোরু এবং জমির ফসল কেটে নিয়ে যায়। যে কারণে সীমান্তে কাঁটাতারের দাবি তাঁদের দীর্ঘদিনের। অস্ত্রপাড়ার বাসিন্দা মহম্মদ করিম বলেন, 'সরকারি সিদ্ধান্তে আমরা খুশি।' স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য আক্রম আলি বলেন, 'এই এলাকার ম্যাপ করা আছে। এর আগে বিএসএফ, বিএলওর সঙ্গে অনেকবার বৈঠক হয়েছে। নো অবজেকশন সার্টিফিকেটেও দেওয়া হয়েছে ছ'মাস আগে। তার পরেও কাজ শুরু হয়নি। নতুন সরকারের এই অর্ডারে খুশি বাসিন্দারা। এই কাজে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব।' দক্ষিন রেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের নতুন পাড়ার বাসিন্দা রঞ্জিত সরকার বলেন, 'এই ঘোষণা বিগত সরকার করলে এতো বছর আমাদের ভুগতে হতো না।'