• ভোটপ্রচারে নেতাদের গরমাগরম ভাষণের জেরে সমস্যায় তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরা
    বর্তমান | ১২ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: ভোটের প্রচারে কেউ এসেছিলেন এসি গাড়িতে চেপে। কেউ আবার হেলিকপ্টারে। সভামঞ্চে উঠে কেউ ডিজে বাজানোর ডাক দিয়েছিলেন, কেউ আবার নির্দিষ্ট দিন বেঁধে দিয়ে ‘খেলা’ দেখানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। নির্বাচনি ময়দানে সেইসব আগুনঝরা ভাষণ মুহূর্তের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর সেই গরমাগরম ভাষণই এখন তৃণমূলের নিচুতলার নেতা-কর্মীদের কাছে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    অভিযোগ, ভোটের ফল প্রকাশের পর পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় একাধিক তৃণমূল কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ ঘরবন্দি, কেউ আবার মারধরের ভয়ে এলাকা ছেড়েছেন। একাধিক নেতা-কর্মী জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। প্রচারের সময় প্রথম সারির নেতাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যই বিরোধী শিবিরকে উসকে দিয়েছে। তারই মাশুল গুনতে হচ্ছে ব্লক ও বুথস্তরের কর্মীদের।

    ভোটের দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিম মেদিনীপুরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছিল। জেলার ১৫টি বিধানসভা কেন্দ্রকে পাখির চোখ করেই ঝাঁপিয়েছিল তৃণমূল। একের পর এক জনসভা করেছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এসেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জেলা নেতৃত্বের বড় অংশই ধরে নিয়েছিলেন, অন্তত ১২টি আসনে জয় নিশ্চিত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জেলার মানুষ তৃণমূলকে সমর্থন জানিয়েছিল। সেই ফলাফলই বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল শাসক শিবিরকে। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর ছবিটা বদলে যায়। জেলার অধিকাংশ আসনই দখল করে গেরুয়া শিবির। এরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্বাচনি প্রচারে দেওয়া বিভিন্ন নেতার মন্তব্য ও হুঁশিয়ারি ঘুরতে শুরু করে। অভিযোগ, সেইসব বক্তব্যকে সামনে রেখেই নিচুতলার তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলা শুরু হয়েছে। এক তৃণমূল নেতা বলেন, বড় নেতারা সভামঞ্চে উঠে বড় বড় কথা বলেছিলেন। তখন হয়তো মনে হয়েছিল এতে কর্মীদের মনোবল বাড়বে। কিন্তু ফল বেরনোর পর সেই ভিডিওগুলোই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হচ্ছে। বিরোধীরা বলছে, এতদিন যারা দাপট দেখিয়েছে, এখন তাদের জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, ২০২১সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী শিবিরের বহু নেতা-কর্মী এলাকাছাড়া হয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এখনও অনেকের মনে তাজা। ফলে এবারের ভোটে পরিবর্তন হতেই প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

    জেলার এক চায়ের দোকানে বসে ক্ষোভ উগরে দেন মেদিনীপুর শহরের বাসিন্দা চঞ্চল দাস। তাঁর কথায়, বড় নেতাদের টাকা আছে। নিরাপত্তা আছে। তাঁরা এখন কলকাতায় বা অন্যত্র নিশ্চিন্তে সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু গ্রামে যারা দল করেছেন তাঁরাই এখন মার খাচ্ছেন। কারও মাথা ফেটেছে, কারও বাড়িতে হামলা হয়েছে। শুনেছি চিকিৎসার খরচও নিচুতলার নেতাদের পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে। অনেক নেতা এখন ফোন পর্যন্ত ধরছেন না। 

    মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতি মহম্মদ রফিক বলেন, নির্বাচনের সময় কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে নেতারা অনেক কথাই বলেন। তবে আমাদের জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দলের কর্মীদের পাশে দল রয়েছে। কোথাও কোনও সমস্যা হলে সংগঠন ব্যবস্থা নেবে। মেদিনীপুরের বিজেপির জয়ী প্রার্থী শঙ্কর গুছাইত বলেন, একটাও যাতে অশান্তির ঘটনা না ঘটে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটা বিজেপির সংস্কৃতি নয়। কেউ দলের নির্দেশ অমান্য করে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।
  • Link to this news (বর্তমান)