সরকারি প্রকল্পে গৃহীত আবেদন ৫ বছর পড়ে তৃণমূল কার্যালয়ে, বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার, মঙ্গলকোটে উত্তেজনা
বর্তমান | ১২ মে ২০২৬
অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: নানা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচি চালু করেছিল তৃণমূল সরকার। শিবির করে আবেদন সহ নথিপত্র গ্রহণ করা হতো। এ ছাড়াও একাধিক সময়ে প্রকল্পভিত্তিক আবেদন তৃণমূল নেতাদের কাছে সরাসরি জমা দিতেন সাধারণ মানুষ। সেগুলি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে জমা করে দেওয়াই দস্তুর। কিন্তু, সোমবার মঙ্গলকোটে উঠে এল অন্য ছবি। তৃণমূলের একটি পার্টি অফিসের পিছন থেকে উদ্ধার হল প্রচুর সংখ্যক নথিপত্র সহ আবেদনপত্র। তারিখ দেখে অনুমান, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে বস্তাবন্দি অবস্থায় সেগুলি পড়েছিল। তা হলে, তৃণমূলের নেতারা কি লোক দেখানো আবেদনপত্র গ্রহণ করতেন? ঘটনাটি জানাজানি হতেই ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার মানুষ। সরব হয়েছে বিজেপি। কাটোয়ার মহকুমা শাসক অনির্বান বোস বলেন, ‘আমি বিডিওকে এ নিয়ে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দেব।’
জানা গিয়েছে, তৃণমূলের ওই পার্টি অফিসটি মঙ্গলকোটের মাজিগ্রামে। এদিন পার্টি অফিসে ঢোকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা দেখতে পান, একাধিক বস্তায় বন্দি হয়ে পড়ে সরকারি নানা প্রকল্পের আবেদনপত্র। কিছু নথিপত্র আবার পোড়ানো হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। এইসব আবেদনপত্রগুলি বিশ্বাস করে তৃণমূলের নেতাদের হাতে দিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। নেতারা সেগুলি ব্লক অফিসে জমা না দিয়ে পার্টি অফিসে ফেলে রাখেন বলে অভিযোগ।
উদ্ধার হওয়া ওইসব নথিপত্র খতিয়ে দেখে জানা গিয়েছে, কেউ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। কেউ কেউ আবার প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, বিধবা ও বার্ধক্য ভাতা সহ নানা প্রকল্পের সুবিধা পেতে লিখিত আর্জি রেখেছিলেন। দুঃস্থ, স্বামীহারা মহিলারাও সাহায্যের জন্য আবেদন করেছিলেন। ২০২০ সাল থেকেই আবেদন করে এসেছিলেন মাজিগ্রাম অঞ্চলের বাসিন্দারা। সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল ইনকাম সার্টিফিকেট, আধার, ভোটার, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এল কীভাবে? ক’দিন আগে পার্টি অফিসের পিছনে পোড়া পোড়া গন্ধ পান সংলগ্ন বাসিন্দারা। তাঁরা সেখানে গিয়ে দেখেন, বহু আবেদনপত্র পোড়ানো হয়েছে। তারপরেই দলবেঁধে পার্টি অফিসে ঢুকে দেখতে পান কয়েক বস্তা আবেদনপত্র পড়ে রয়েছে। কোয়াঁরপুর গ্রামের বাসিন্দা উত্তম কুমার রায় বলেন, ‘আমরা ৮ জন বেকার ছেলে মিলে স্বনির্ভর গোষ্ঠী করার জন্য আবেদন করেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম চোখের বালি। তৃণমূল নেতারা আশ্বাস দিয়েছল। এখন দেখছি, আমাদের আবেদনপত্র সরকারি অফিসে জমাই পড়েনি।’ মাজিগ্রামের বাসিন্দা অমিত দত্ত বলেন, আমার বাবা মৃত হৃদয়চাঁদ দত্ত সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে আবেদন করেছিলেন ২০২০ সালে। বাবা ২০২২ সালে মারা যায়৷ এখন আমার বাবার সেই আবেদনপত্র তৃণমূলের পার্টি অফিসে দেখতে পেলাম! এটা তো মানুষের সঙ্গে প্রতারণা।’ একই বক্তব্য বিপদত্তারণ পাল, মহাদেব ঘোষ, উত্তম রায়দের কাঁকোড়া গ্রামের বাসিন্দা মনোরা বিবি বলেন, ‘আমি বাড়ি পেতে আবেদন জমা দিয়ে এসেছিলাম। এখন দেখছি নেতারা জমাই দেননি৷ তাই ঘরটাও পাইনি।’
মাজিগ্রাম অঞ্চলের অনেকেরই অভিযোগ, তৃণমূলের নেতারা টাকা নিয়ে আবেদন জমা নিয়েছিলেন। বিজেপির মঙ্গলকোট ৩ নম্বর মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদক সৌমেন মুখোপাধ্যায় বলেন, তৃণমূলের নেতারা গরিবব মানুষের কাছে টাকা নিয়ে এইসব আবেদন জমা নিয়ে ভাঁওতা দিয়েছিলেন। এই ঘটনা তার বড় প্রমাণ।’ তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক অপূর্ব চৌধুরী বলেন, ‘আবেদনপত্রগুলি কেন পার্টি অফিসে পড়েছিল, তা নিয়ে খোঁজখবর নেব।’