সিউড়িতে জেলা পরিষদে সরল মমতার ফটো, ঝুলল মোদির ছবি,পরিবর্তন রামপুরহাট পুরসভা, ব্লক ও এসডিও অফিসের চিত্রও
বর্তমান | ১২ মে ২০২৬
নিজস্ব সংবাদদাতা, সিউড়ি: নবান্নে পালাবদলের পর এবার বীরভূমের প্রশাসনিক মহল থেকে ‘মমতা-সংস্কৃতির’ শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে ময়দানে নামল বিজেপি। সোমবার জেলাজুড়ে সরকারি দপ্তরগুলিতে চলল নজিরবিহীন ‘ছবি বদল’ অভিযান। তৃণমূল জমানার দীর্ঘকালীন প্রথার অবসান ঘটিয়ে এদিন পঞ্চায়েত, পুরসভা থেকে জেলা পরিষদ— সর্বত্র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেওয়াল থেকে নামিয়ে সেখানে বসানো হল ভারতমাতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি। আর এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জেলার প্রশাসনে তৈরি হল তীব্র উত্তেজনা। বিজেপির সাফ হুঁশিয়ারি— প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির ‘ঘুঘুর বাসা’ এবার চুরমার করার সময় এসেছে।
সোমবার সকাল থেকেই বীরভূমের রাজনৈতিক পারদ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। জেলা সদর সিউড়ি থেকে শুরু করে রামপুরহাট— সর্বত্রই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল গেরুয়া শিবির। এদিন সকালে প্রথমে সিউড়ি পুরসভায় যান বিজেপির নেতারা। দেখেন পুরপ্রধান উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের ঘর বন্ধ। তাতেই মেজাজ হারান বিজেপি কর্মীরা। পরে চেয়ারম্যান আসেন। তারপর তাঁর ঘরের দেওয়ালে ভারতমাতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়। উজ্জ্বলবাবু বলেন, ‘আমায় আগাম জানিয়ে এই কর্মসূচি করলে শোভা পেত।’ কিন্তু বিজেপি কর্মীরা এদিন ছিলেন দস্তুরমতো ‘দখলদারি’ মেজাজে। তাঁদের রোখা যায়নি।
এরপরেই বীরভূম জেলা পরিষদে যান বিজেপি নেতাকর্মীরা। বিজেপির জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সহ সভাপতি দীপক দাস, সাধারণ সম্পাদক শ্যামসুন্দর গরাইয়ের নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী রীতিমতো দাপট দেখিয়ে ঢুকে পড়ে জেলা সভাধিপতি কাজল শেখের কক্ষে। সভাধিপতি অনুপস্থিত থাকলেও পরোয়া করেননি গেরুয়া শিবিরের নেতাকর্মীরা। এরপর খোদ সভাধিপতির চেয়ারের ঠিক পিছনে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি এক ঝটকায় দেওয়াল থেকে নামিয়ে দেন বিজেপি কর্মীরা। টাঙিয়ে দেওয়া হয় ভারতমাতা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি।
এই ঘটনায় অপমানে ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন কাজল শেখ। নিজের ফেসবুকে ঘটনার ভিডিও পোস্ট করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ক্ষমতার দম্ভে উন্মত্ত বিজেপি! একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অবর্তমানে তাঁর সরকারি চেম্বারে ঢুকে এই আচরণ কি গণতন্ত্রের পরিচয়?’ তবে কাজল শেখের মন্তব্যকে পাত্তা দিতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব। জেলা সভাপতি বলেন, বীরভূম জেলা পরিষদ এতদিন দুর্নীতির আখড়া হয়ে ছিল। টেন্ডার থেকে শুরু করে নিয়োগ— সব জায়গায় যে সিন্ডিকেট রাজ চলত, সেই ‘ঘুঘুর বাসা’ এবার ভাঙা হবে।
রামপুরহাটেও এদিন একই মেজাজ ধরা পড়েছে। মহকুমা শাসক অশ্বিন বি রাঠোরের অনুপস্থিতিতেই বিজেপি নেতৃত্ব কার্যত বাধ্য করেন এক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে অফিস খোলাতে। সেখানেও মমতা-বন্দনা সরিয়ে ভারতমাতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি স্থাপনের মাধ্যমে বিজেপি বার্তা দেয় যে, জেলায় নতুন শাসনতন্ত্র কায়েম হয়েছে। একইভাবে রামপুরহাট ১ ব্লক অফিস এবং পুর চেয়ারম্যানের ঘরেও ওই কর্মসূচি পালন করা হয়। বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক শান্তনু মণ্ডল কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন, ‘তৃণমূল জমানায় সরকারি দপ্তরগুলো চালাত তাদের পোষা গুন্ডারা। সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তারা পুরোপুরি পঙ্গু করে দিয়েছিল। সেই পচা ও অচল ব্যবস্থা ছুড়ে ফেলে নতুন প্রশাসনের সূচনা করাই আমাদের লক্ষ্য। ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’-এর মন্ত্র আর জাতীয়তাবাদের প্রতীক ভারতমাতাকে সামনে রেখেই এই নতুন পথচলা।’
সিউড়ি ১ পঞ্চায়েত সমিতি, কড়িধ্যা, চিনপাই, সাঁইথিয়া থেকে নলহাটির কুরুমগ্রাম— সর্বত্র এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিজেপি সাধারণ মানুষকে এই বার্তাই দিতে চাইল— ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’।