নাম বদলের চর্চা নিয়েই ফের চালু পাঁচ টাকায় দুপুরের খাবার
আনন্দবাজার | ১২ মে ২০২৬
পর পর থালায় সয়াবিন মেশানো ডাল-ভাতের উপরে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে সেদ্ধ ডিম। লম্বা লাইন পেরিয়ে পাঁচ টাকার বিনিময়ে এমনই একটি থালা হাতে পেয়ে কপালের কাছে নমস্কারের ভঙ্গিতে তুলে ধরলেন বৃদ্ধ। এর পরে বললেন, ‘‘গত কয়েক দিন রোজ ফিরে গিয়েছি। দুপুরে এই খাবার না পাওয়ায় হোটেলে খেতে এত বেশি খরচ পড়ছিল যে, এক বেলাই খাচ্ছিলাম। আমার মতো অনেকেই তো এই খাবারটুকুর উপরে নির্ভরশীল।’’
এসএসকেএম হাসপাতালে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ শ্রুতিনাথ গুপ্ত যখন এ কথা বলছিলেন, তত ক্ষণে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করে দিয়েছেন, চালু থাকা কোনও সামাজিক প্রকল্পই বন্ধ করা হবে না। শ্রুতিনাথ অবশ্য সেই খবর জানতেন না। ক্যান্টিনের কাট-আউটে ‘মা ক্যান্টিন’ লেখাটি খবরের কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কাছেই গ্যারাজে কাজ করা এক বৃদ্ধ বললেন, ‘‘মা ক্যান্টিনের নাম হয়তো বদলে যাবে। কিন্তু প্রকল্পটা থাকুক।’’
ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে বর্ধমান থেকে আসা কবিতা মণ্ডল আবার বললেন, ‘‘প্রতি সপ্তাহে দু’দিন আসতে হয়। স্বামী শয্যাশায়ী। একা যা রোজগার করি, তাতে শহরে বাড়তি খরচ করে খাওয়া খুব কষ্টের।’’
খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, প্রথম দফার ভোটগ্রহণ, অর্থাৎ ২৩ এপ্রিলের আগের দিন থেকেই বহু জায়গায় ‘মা ক্যান্টিন’-এর খাবার পৌঁছনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শহরের একাধিক সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বরেও ২৫ এপ্রিল থেকে আগের মতো খাবার পৌঁছচ্ছিল না। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তদের দাবি, নির্বাচনের জন্য বহু জায়গায় কমিউনিটি কিচেন ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সেগুলিতে কোথাও রাজনৈতিক দলের শিবির তৈরি করা হয়েছিল, কোথাও আবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশের জন্য ‘মা ক্যান্টিন’ এবং মিড-ডে মিলের খাবার তৈরি হয়, এমন এক জায়গায় আবার সরাসরি ভোটকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি, গত কয়েক দিন ধরে ডাল, আলু, ডিমের জোগান না থাকায় রান্না বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
চেতলা এলাকার শ্যাম বসু রোডের একটি কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে দক্ষিণ কলকাতার ২৪টি স্কুল ও ১৫টি ওয়ার্ডভিত্তিক কেন্দ্রে মা ক্যান্টিনের খাবার যায়। রান্নাঘরটি যে স্বনির্ভর গোষ্ঠী চালায়, সেটির প্রধান শাশ্বতী সাহি বললেন, ‘‘আমাদের রান্নাঘরেই ভোটকেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। ফলে ভোটের কয়েক দিন আগে থেকেই রান্না বন্ধ করে দিতে হয়। ফল ঘোষণার পরে ৬ এবং ৭ মে দু’দিন শুধু মা ক্যান্টিনের রান্না করা গিয়েছিল। কিন্তু ডিম-সহ একাধিক জিনিসের জোগান না থাকায় ফের বন্ধ হয়ে যায়। এ দিন থেকে আবার রান্না হচ্ছে।’’
সোমবার দুপুরে ওই কমিউনিটি রান্নাঘরে পৌঁছে দেখা গেল, ‘মা ক্যান্টিন’ লেখা বোর্ডে ‘মা’ শব্দটি প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এসএসকেএম হাসপাতাল-সহ দক্ষিণের একাধিক জায়গা থেকে রান্না করা খাবার ফিরে আসছে। ক্যান্টিনের কর্মী রূপা মণ্ডল বললেন, ‘‘রোজ ৪০০০ লোকের খাবার যায়। অনেকেই জানতেন না, ক্যান্টিন আবার চালু হয়েছে। ফলে কিছু খাবার ফিরে এসেছে।’’
উত্তর কলকাতার একাধিক জায়গায় খাবার যায় টালা থানা সংলগ্ন মা ক্যান্টিনের রান্নাঘর থেকে। সেখানকার এক কর্মীর মন্তব্য, ‘‘আর জি কর হাসপাতালে প্রচুর মানুষকে আবার খাওয়ানো গেল। স্বনির্ভর গোষ্ঠীই মূলত এই ক্যান্টিন চালায়। তাদেরও কর্মহীন হতে হল না।’’
কলকাতা পুরসভাই এই প্রকল্পের সমস্ত কাজ পরিচালনা করে। কলকাতা পুরসভার সমাজকল্যাণ বিভাগের মেয়র পারিষদ মিতালি বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘কিছু সমস্যা ছিল। সে সব কাটিয়ে উঠে আবার পাঁচ টাকায় দুপুরের খাওয়ার প্রকল্প শুরু হয়েছে।’’