পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার কারণে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি বাজারে এখন তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ভারতকে আবার তার চাহিদার অধিকাংশ তেল ও গ্যাসই আমদানি করতে হয়। স্বাভাবিক ভাবেই বর্তমানে অনেকটা বেড়েছে এই আমদানীর ব্যয়। আগাম সতর্কতা হিসেবে দেশজুড়ে জ্বালানি সাশ্রয় ও কিছু কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে কথায় বলে ‘আপনি আচরি ধর্ম শিখাও অপরে’। তাই সরকারও দেশবাসীকে পরামর্শ দেওয়ার আগে, নিজেদের দিয়েই এই পদক্ষেপ শুরু করছে। মন্ত্রী-আমলাদের উপরে নানা বিধিনিষেধ চাপাতে চলেছে মোদী সরকার।
সরকারি সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় মন্ত্রকগুলিকে ব্যয় সংকোচনের বদলে মূলত জ্বালানি সাশ্রয়ের দিকে নজর দিতে বলা হয়েছে:
মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ আমলাদের অপ্রয়োজনীয় দেশি-বিদেশি সব ধরনের সফর কমাতে বলা হয়েছে। এর বদলে সেমিনার এবং সরকারি বৈঠকগুলি যথাসম্ভব অনলাইনে (ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে) করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি আধিকারিকদের, বিশেষ করে কর্তব্য ভবনে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের যাতায়াতের জন্য মেট্রোরেল বা অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা হাইব্রিড মডেলে কাজ করা বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে।
বড় বড় সরকারি ভোজ, যেখানে অতিথিদের যাতায়াতের ফলে বেশি পরিমাণে জ্বালানি খরচ হয়, বিপুল রান্নার গ্যাস খরচ হয়, এমন সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে ব্যাপক কাটছাঁট করা হচ্ছে।
সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশে এখনও পর্যন্ত কোনও জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়নি। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল এবং ৪৫ দিনের LPG মজুত রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে দেশের তেল সংস্থাগুলির উপরে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বোঝা চাপছে। আমদানি খাতে এই বিপুল ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি সামাল দিতেই সরকার আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে।
মোদী সরকারের এই নীতির সার কথা হলো— ‘সঙ্কটের সময়ে সাশ্রয় নয়, সঙ্কট এড়াতেই আগাম সাশ্রয়।’
সরকারি স্তরে এই পদক্ষেপ সফল হলে পরবর্তী সময়ে বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিকরাও গণপরিবহণ ব্যবহার, বাড়ি থেকে কাজ করা এবং বড় কোনও জমায়েত বা বিয়ের অনুষ্ঠানে কাটছাঁট করার পথে হাঁটতে উৎসাহিত হবে বলে আশা করছে কেন্দ্র।
মজার বিষয় হলো সরকার যখন মন্ত্রী-আমলাদের সফর কাটছাঁট করছে, সাধারণ মানুষকে এক বছর অপ্রয়োজনীয় বিদেশযাত্রা স্থগিত রাখতে পরামর্শ দিচ্ছে, একই সময়ে পাঁচ দেশ সফর যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ১৫ থেকে ২০ মে পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি সফরে যাচ্ছেন তিনি।
স্বাভাবিক ভাবেই এই ‘বৈপরীত্য’ নিয়ে নিন্দায় সরব বিরোধীরা। তাঁর বৈদেশিক কর্মসূচিগুলি ভার্চুয়ালি করা যেত না? প্রশ্ন করছেন তাঁরা।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই পাঁচ দেশ সফরের বেশ কিছু কর্মসূচি ভার্চুয়ালি করা গেলেও নরওয়েতে তৃতীয় ভারত-নর্ডিক সামিট বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে যে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে, সেই বিষয়গুলি ভার্চুয়ালি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর, বাণিজ্যিক লগ্নি এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক আবহে পারস্পরিক আস্থা নির্মাণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনেতাদের সশরীরে উপস্থিতি অপরিহার্য। তাই মন্ত্রী-আমলা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তা দিলেও, দেশের বৃহত্তর কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থেই এই মেগা সফরে বের হতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে।
তবে সদ্য সমাপ্ত পাঁচ রাজ্যের ভোট চলাকালীন প্রচারের স্বার্থে BJP নেতাদের রাজ্যে রাজ্যে সফর করা, একের পর এক রোড শো করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকরা বলছেন, সঙ্কট এড়াতে আগাম ব্যবস্থা নিতে হলে তো ভোটের আগেই তা নেওয়া উচিত ছিল। জ্বালানি সঙ্কট তো ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই তৈরি হয়েছে। তা হলে কি দেশের স্বার্থেরও আগে নির্বাচন?