বসবে কাঁটাতারের বেড়া, বেজায় খুশি এই এলাকার মানুষেরা
আজকাল | ১৩ মে ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক শেষে তিনি ঘোষণা করেছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় আর দেরি নয়। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যেই সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া বসানোর জন্য বিএসএফ-কে প্রয়োজনীয় জমি দেবে রাজ্য।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তে মুর্শিদাবাদের রানীনগর, ভগবানগোলা, লালগোলা, জলঙ্গির মতো সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের চোখে-মুখে এখন স্বস্তির হাসি । স্থানীয়দের কথায়, শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশ নয়, গরু পাচার, জাল ওষুধ, মাদক পাচারকারীতে ভরে গিয়েছিল এলাকা। কাঁচা টাকার লোভে স্কুলপড়ুয়ারাও জড়িয়ে পড়ত মাদকপাচার চক্রে। তাদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষিত হলে, সুরক্ষিত হবে তাঁদের জীবনও।
পশ্চিমবঙ্গে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ২২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে বিএসএফের পক্ষে কাঁটাতারের বেড়া লাগানো সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় ৫৫০ কিলোমিটারের মধ্যে ১১৩ কিলোমিটার এলাকায় বিএসএফের তরফ থেকে কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এই এলাকায় গঙ্গা-পদ্মা এবং ইছামতির মতো নদী দুই দেশের সীমান্ত ভাগ করেছে। বাকি যে অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব সেই জমি এতদিন রাজ্য সরকার বিএসএফের হাতে তুলে দিচ্ছিল না বলে বারে বারে অভিযোগ উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সোমবার প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কাঁটাতারের বেড়া তৈরীর জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জমি বিএসএফের হাতে রাজ্য সরকার তুলে দেবে।
মুর্শিদাবাদ জেলায় ফরাক্কা -সামশেরগঞ্জ থেকে শুরু করে জলঙ্গি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অংশে কোথাও গঙ্গা-পদ্মা নদী এবং কোথাও বিস্তীর্ণ চরের জমি আর কোথাও সাধারণ ভূখণ্ড ভারত-বাংলাদেশের সীমা নির্ধারণ করেছে। বিএসএফের তরফ থেকে মুর্শিদাবাদ জেলায় বেশ কিছুটা অংশে কাঁটাতারের বেড়া বসানো সম্ভব হলেও জমি জটে আটকে ছিল রানীনগর সহ অন্যান্য বেশ কিছু এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ।
দু'দেশের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া না থাকার সুযোগ নিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলা দিয়ে একদিকে বাংলাদেশ থেকে যেমন অবাধে অনুপ্রবেশ হয়ে চলেছে, তেমনই দু'দেশের সীমান্তবর্তী বেশ কিছু গ্রাম চোরচালানকারীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার এক শ্রেণির অসাধু জনপ্রতিনিধিদের সাহায্য নিয়ে বেআইনিভাবে রেশন কার্ড , আধার কার্ড সহ অন্যান্য ভারতীয় নথি তৈরীর কাজ একশ্রেণীর মানুষ ফেঁদে বসেছে। এছাড়াও একসময় মুর্শিদাবাদ জেলা দিয়ে দুই দেশের মধ্যে অবাধে পশু চোরাচালান হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এখনও কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত দিয়ে মাঝেমধ্যেই পশু-সহ গোপনে মাদক ,বহু ধরণের ওষুধ, খাদ্যদ্রব্য সহ অন্যান্য প্রচুর জিনিস বেআইনিভাবে বাংলাদেশে পাচার হয়।
এর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী গ্রামবাসীদের বড় চিন্তার কারণ বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা। জমি জটের কারণে যে সমস্ত এলাকায় বিএসএফের তরফ থেকে এখনও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি সেখানে মাঝে মধ্যেই অভিযোগ ওঠে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা রাতের অন্ধকারে ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করে কৃষকদের ফসল কেটে নিয়ে চলে যায়।
মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা সঞ্জয় প্রামাণিক বলেন," এখানে সিংপাড়া থেকে এক কিলোমিটার মতো এলাকায় কিছুটা কাঁটাতারের বেড়া তৈরীর কাজ হলেও শেখপাড়া, কাহারপাড়া, দুর্গাপুর, হারুডাঙ্গা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমরা চাইছিলাম এই এলাকায় বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দিক। কিন্তু তৃণমূল সরকার বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি দেয়নি। তার ফলে রাতের অন্ধকারে কখনও নৌকা করে ,আবার কখনও পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা এই দেশে এসে অপরাধ করে পালিয়ে যেত। তার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো দুষ্কৃতীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠছিল। বিএসএফ সীমান্তে বেড়া দিলে আমরা সমস্ত অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবো। "
ওই এলাকারই বাসিন্দা তাপস কুমার মণ্ডল বলেন, 'আমাদের এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্ত। এখানে গরু এবং অন্যান্য পাচারকারীদের ভয়ে আমরা তঠস্থ হয়ে থাকি। তারা যা খুশি করে। এই এলাকা দিয়ে অবাধে অনুপ্রবেশ হয়। বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া দিলে কৃষকসহ সীমান্ত এলাকার গ্রামের বাসিন্দাদের অনেক উপকার হবে। কাঁটাতারের বেড়া তৈরীর জন্য সকলে জমি দিতে প্রস্তুত রয়েছে।'
নাম না প্রকাশের শর্তে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা জানান, চোরাচালান করে অল্প সময়ে প্রচুর কাঁচা টাকা উপার্জন করা সম্ভব। সীমান্তে কোনও বেড়া না থাকায় বছরের পর বছর ধরে এলাকার দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের শৈশব এবং কৈশোর নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাঁরা কাঁচা টাকার লোভে বিভিন্ন অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়েন। তারপর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে শাস্তি ভোগ করতে হয়। সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলে পাচার বন্ধ হবে। এলাকার প্রচুর মানুষকে অন্য কাজ খুঁজতে হবে। ফলে এলাকায় অপরাধ কমবে।
বিএসএফকে রাজ্য সরকারের জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তে গোটা রাজ্যের মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলা সবথেকে বেশি উপকৃত হবে বলে মনে করেন মুর্শিদাবাদের বিজেপি বিধায়ক গৌরীশংকর ঘোষ। তিনি বলেন, 'এই রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে সব থেকে বেশি অনুপ্রবেশ মুর্শিদাবাদ জেলা দিয়েই হয়। মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষনা করেছেন আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে রাজ্য ভূমি রাজস্ব দপ্তর বিএসএফকে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করবে। বিএসএফ সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া তৈরির কাজ শেষ করতে পারলে মুর্শিদাবাদ জেলা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। এরফলে দেশ এবং রাজ্যের অর্থনীতি উন্নত হবে এবং দেশে নাশকতার সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে।' গৌরীশংকর বলেন, 'মুর্শিদাবাদ জেলায় ফরাক্কা থেকে শুরু করে জলঙ্গি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সীমান্ত এখনও উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় কেন্দ্র সরকার বারবার অনুরোধ করলেও বিএসএফকে সীমান্তে 'ফেন্সিং' তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জমি তৎকালীন সরকার দেয়নি। আমাদের সরকার বিএসএফের হাতে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জমি তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও আমরা আশাবাদী এই কাজ তার আগেই শেষ হয়ে যাবে। 'ফেন্সিং' তৈরির কাজ শেষ হলে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে আর নিরাপত্তাহীনতা থাকবে না।'