কেন্দ্রের উদ্যোগে মাওবাদী দমনে যৌথবাহিনীর কড়া ঘেরাটোপে সারান্ডায় বন্দি হয়ে গিয়েছিলেন। পাহাড়-জঙ্গলঘেরা সিপিআই (মাওবাদী) হেড কোয়ার্টারে ফুরিয়ে গিয়েছিল চিকিৎসার রসদ। পর্যাপ্ত রেশন সামগ্রী, গুলি-বারুদ থাকলেও জঙ্গলযুদ্ধ চালাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রীও শেষ। তাই ম্যালেরিয়ায় কাবু মাওবাদী নেত্রী, আঞ্চলিক কমিটির সদস্য শ্রদ্ধা বিশ্বাস ওরফে বেলা চিকিৎসার জন্য বাংলায় আসেন। বেছে নিয়েছিলেন ভোট শেষ এবং গণনার আগের সময়কে। যেহেতু ওই সময়ে ভোটের ফলাফলের দিকে সকলের নজর থাকবে, তাই গোয়েন্দা ও পুলিশকে ধুলো দিয়ে নদিয়ার চাকদহের কাশিমপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। কিছুটা সুস্থ হলেই ছদ্মবেশে অসমে গা ঢাকা দেওয়া লক্ষ্য ছিল মাও নেত্রীর। কিন্তু তা আর হলো না। ঝাড়খণ্ড পুলিশের সহায়তায় রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের এসটিএফ যৌথ উদ্যোগে শ্রদ্ধা ওরফে বেলাকে গ্রেপ্তার করে।
গত দু’দশকের বেশি সময় ধরে কখনও জঙ্গল যুদ্ধে, আবার কখনও শহরে, শিল্পতালুকে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মাওবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাঁচ-পাঁচটি আলাদা নাম নিয়ে সক্রিয়ভাবে ছিলেন মাওবাদী স্কোয়াডে। কখনও বেলা সরকার, কখনও পঞ্চমী, আবার কখনও দীপা সরকার, সন্ধ্যা বিশ্বাস, শ্রদ্ধা বিশ্বাস। মাওবাদ দমনে বাংলা-ঝাড়খণ্ডের পুলিশ আধিকারিকদের রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিলেন এতগুলি ছদ্মনামে কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া নেত্রী। তাঁর মাথার দাম ছিল ১৫ লক্ষ টাকা। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, বাংলা থেকে অসমে চলে গিয়ে অন্য নাম নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তিনি আবার মাওবাদী নেতা গৌর চক্রবর্তীর শ্যালিকা। আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদের লালগোলা থানার লালগোলা হরিপট্টিতে।
বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্ট নামে সংগঠনের মুখপাত্র অর্ঘ্যজিৎ প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গত সোমবার ১১ই মে ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ নদিয়ার চাকদহ থানার অন্তর্গত কাশিমপুর গ্রামে এপিডিআর সদস্য কিশোর সর্দারের বাড়ি থেকে ওই নেত্রী সহ আরও একজনকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। শ্রদ্ধা বিশ্বাস নামে ওই মহিলা প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড গৌর চক্রবর্তীর পত্নীর বোন। ৫৫ বছর বয়সী এই মাও নেত্রীর স্বামীর নাম শ্যাম শিঙ্কু। স্কোয়াডে থাকাকালীন তাঁদের ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি স্ত্রীর টানেই আবার স্কোয়াডে ফিরে যান। তার বাড়ি ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার চাইবাসার কুমারডুঙির
পোখরিয়াতে।
তিনি ঝাড়খণ্ডের সক্রিয় এক মাওবাদী রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। সারান্ডার জঙ্গলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তীব্র দমন-পীড়ন ও ঘেরাও অভিযানের মুখে শ্রদ্ধা ওরফে বেলা এবং অপর এক কথিত মাওবাদী রাজনৈতিক কর্মী চিকিৎসার জন্য বাংলায় আসেন। কারণ, তাঁরা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। শ্রদ্ধা বিশ্বাস অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন, বমি করছিলেন। এপিডিআরের সদস্য মানবিক কারণে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তিনি তাঁদের কথিত রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্টের তরফে আশঙ্কা প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, তাদের ভুয়ো ‘এনকাউন্টারে’ বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাই কোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের করা হচ্ছে
মাওবাদ দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ডেডলাইন ছিল ৩১ মার্চ, ২০২৬। সেই অনুযায়ী মাওবাদী উপদ্রুত রাজ্যগুলিতে যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান চলছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ওই সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার পাহাড়-জঙ্গলে এখনও ৪০-৪৫ জন মাওবাদীদের সশস্ত্র স্কোয়াড রয়ে গিয়েছে। যেখানে সিপিআই (মাওবাদী)-র পলিটব্যুরো সদস্য মিসির বেসরার মতো দুর্ধর্ষ মাও নেতা ছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অসীম মন্ডল ওরফে আকাশ আছেন। সেখানেই ছিলেন এই মাও নেত্রী বেলা।