• ‘অতীতের প্রভাবশালী মন্ত্রী তদন্ত প্রভাবিত করতে পারেন’, বলল ইডি! সুজিতকে ১০ দিনের হেফাজতে পাঠাল আদালত
    আনন্দবাজার | ১৩ মে ২০২৬
  • রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে হেফাজতে নিতে চেয়ে আবেদন করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তাদের আইনজীবী আদালতে সওয়াল করে জানান, অতিমারির সময়ে সুজিতদের রেস্তরাঁ বন্ধ থাকলেও কোটি টাকার উপর লেনদেন হয়েছে। তিনি প্রভাবশালী ছিলেন, এখন তিনি ছাড়া পেলে তদন্ত প্রভাবিত করবেন বলে ইডির আশঙ্কা। তাদের তরফে সুজিতকে ১০ দিনের জন্য হেফাজতে নিতে চেয়ে আবেদন করা হয়। সুজিতের আইনজীবীর প্রশ্ন, ২০২২-২৩ সালের নথির ভিত্তিতে কেন এখন গ্রেফতার করা হচ্ছে তাঁর মক্কেলকে। সিবিআই পুরনিয়োগ মামলায় যে চার্জশিট দিয়েছে, তাতেও সুজিতের নাম নেই বলে সওয়াল করেছেন তাঁর আইনজীবী। আদালত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আবেদন মেনে ১০ দিনের ইডি হেফাজতের নির্দেশ দিল।

    ইডির আইনজীবী আদালতে সওয়াল করে জানান, ⁠প্রথমে সুজিত সমনে সাড়া দেননি। পরে তিনি কলকাতা হাই কোর্টে যান। তাদের অভিযোগ, ⁠সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিচ্ছেন না রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী। তদন্তে ⁠অসহযোগিতা করেছেন। ইডির দাবি, ⁠এর পর তিনি ছাড়া পেলে অন‍্যদের সতর্ক করে দেবেন, কারণ, তিনি ‘প্রভাবশালী’ ছিলেন। এর ফলে তদন্ত ব‍্যাহত হবে। তিনি সাক্ষ‍্যপ্রমাণ প্রভাবিত করতে পারেন। ইডির সওয়াল, নিয়োগ মামলায় ধৃত ⁠অয়ন শীলের থেকে যে সব ডিজিটাল তথ‍্য পাওয়া গিয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে, সুজিত বেশ কয়েক জন চাকরিপ্রার্থীর নাম সুপারিশ করেছেন দক্ষিণ দমদম পুরসভায়। উঠে এসেছে নিতাই দত্তের নামও। অভিযোগ, তাঁর মাধ্যমেই চাকরির সুপারিশ করা হত।

    ইডির দাবি, ⁠বেনামি লেনদেন-সহ সুজিতের পরিবারের নামে যে সব সম্পত্তি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। ⁠সুজিত এবং তাঁর পরিবারের ব‍্যাঙ্ক অ‍্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখে কোটি কোটি টাকা ডিপোজ়িটের হিসাবও মিলেছে বলে দাবি ইডির। তাদের দাবি, ⁠চাইনিজ রেস্তরাঁ, বেঙ্গল ধাবা এবং অপর একটি রেস্তরাঁয় নগদ ডিপোজ়িট হয়েছে। ইডির আইনজীবীর সওয়াল, দেখা গিয়েছে অতিমারির সময়ে ⁠লকডাউনে সুজিতের রেস্তরাঁয় ১.১১ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছিল। সে সময় রেস্তরাঁ বন্ধ ছিল, কর্মচারীরা বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ইডির প্রশ্ন, তবুও কী করে কোটি টাকার বিক্রি হল। ইডির দাবি, টাকা তছরুপ করা হয়েছিল। অতিমারির সময়ে ধাবা বন্ধ থাকলেও ২.২ কোটি টাকা সুজিতের ব্যক্তিগত অ‍্যাকাউন্টে গিয়েছিল। ⁠একাধিক ব‍্যক্তির সঙ্গে তৃণমূল নেতার টাকা লেনদেনের হদিস পাওয়া গিয়েছে, যার কোনও আইনগত যোগাযোগ বা কারণ পাওয়া যায়নি।

    আদালতে সওয়াল করে ইডি দাবি করে, দক্ষিণ দমদম পুরসভায় ১৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম বেআইনি ভাবে সুপারিশ করেছিলেন সুজিত। ধৃত অয়নের থেকে এ বিষয়ে একাধিক তথ‍্য পাওয়া গিয়েছে। ওই বিষয়ে নিতাইয়ের যোগাযোগের কথা উঠে এসেছে। ইডির দাবি, একাধিক সূত্র থেকে টাকা আসার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, সেই টাকা বিভিন্ন ভাবে ‘চ‍্যানেলাইজ়’ করা হয়েছে।

    সুজিতের আইনজীবী তাঁর মক্কেলের জামিনের আবেদন করেন। তাঁর সওয়াল, ইডি যে নথির উপর ভিত্তি করে সুজিতকে গ্রেফতার করেছে, সেই সব নথি ২০২২-২৩ সালের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে। তা হলে ২০২৬ সালের মে মাসে এসে কেনও গ্রেফতার করা হল সুজিতকে? ২০২২ সালে পুর নিয়োগ মামলায় যে বয়ান নেওয়া হয়েছিল, তার উপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালে সুজিতকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছে ইডি। সুজিতের আইনজীবীর দাবি, তদন্তের জন‍্য নয়, অন‍্য কোনও কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রাক্তন বিধায়ককে। তিনি বলেন, ‘‘ইডি বলছে আমি তদন্ত প্রভাবিত করতে পারি। ২০২২ থেকে তো তদন্ত চলছে। তখন তো প্রভাবিত করিনি!’’ তাঁর আইনজীবীর দাবি, সিবিআই যে চার্জশিট দিয়েছে, তাতে সুজিতের নাম নেই।

    তদন্তের এই পর্যায়ে, ইডির যে আইনগত ক্ষমতা রয়েছে, তাতে শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন‍্য সুজিতকে ইডি গ্রেফতার করে হেফাজতে নিতে পারে কি না, তা নিয়েও সওয়াল করেন সুজিতের আইনজীবী। কারণ, ইডির আইন অনুযায়ী, কোনও অভিযুক্ত ‘গিল্টি’ (দোষী), এটা মনে করার পর্যাপ্ত কারণ থাকলে তাঁকে গ্রেফতার করা যেতে পারে। কিন্ত সুজিতের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে তার পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

    ইডির আইনজীবী জানান, যাকে গ্রেফতার করা হয়, তাঁকে যে মূল অভিযোগের ক্ষেত্রেও গ্রেফতার হতে হবে বা সেই মামলায় গ্রেফতার না হলে, ইডি তদন্ত করতে পারবে না, এ রকম কোনও বিষয় নেই। কেন ২০২২ সালের তদন্তপ্রমাণের ভিত্তিতে এখন সুজিতকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে ইডির আইনজীবী বলেন, ‘‘আমরা তো সবজান্তা নই। একটা করে ধাপ এগোতে এগোতে ছবিটা পরিষ্কার হয়েছে। ভিত শক্ত না করলে বলা হত, তদন্ত না করে গ্রেফতার করা হয়েছে।’’ ইডির আরও দাবি, স্বভূমি প্রোজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেড নামে সংস্থাতেও ‘রহস‍্যজনক’ লেনদেন হয়েছে। তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন। ধৃত অয়নের সঙ্গেও শেয়ার সংক্রান্ত যোগাযোগ মিলেছে। ভুয়ো সংস্থায় এবং জমিতে টাকা বিনিয়োগ এবং তছরুপ হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইডি।

    সোমবার রাতে সুজিতকে গ্রেফতার করার পর মঙ্গলবার সকালে তাঁর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়। সিজিও কমপ্লেক্সের ইডি দফতর থেকে সুজিতকে নিয়ে যাওয়া হয় বিধাননগর হাসপাতালে। সেখানে স্বাস্থ্যপরীক্ষার পরে হাজির করানো হয় ব্যাঙ্কশাল কোর্টে। কিছু আইনজীবীর অভিযোগ, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিতকে কোর্টে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। লকআপে না রেখে তাঁকে পাখার নীচে বসতে দেওয়া হয়েছে।

    সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় সিজিও-তে হাজিরা দিয়েছিলেন সুজিত। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটির তরফে সুজিতকে গ্রেফতার করার কথা জানানো হয়। এর আগে গত ১ মে ইডির দফতরে হাজিরা দিয়েছিলেন তিনি। তবে ৪ মে, ভোটের ফলঘোষণার পরে সোমবারই প্রথম ইডির দফতরে হাজিরা দিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর আইনজীবী।

    ইডি সূত্রে খবর, পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনি ভাবে চাকরিপ্রাপকদের নাম সুপারিশ করার ঘটনায় তাঁকে তলব করা হয়েছিল। ইডি সূত্রে জানা যাচ্ছে, ওই তালিকায় কম বেশি ১৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম রয়েছে। তাঁদের নাম সুপারিশ করার বিনিময়ে সুজিত অন্যায্য সুবিধা নিয়েছিলেন বলেও ইডি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গিয়েছে বলে মনে করছে ইডি। সেই জন্য একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই মামলাতে সোমবার রাত সওয়া ৯টা নাগাদ গ্রেফতার করা হয় বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্রের সদ্য-পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী সুজিতকে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)