• শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজের উপরেই জোর, সমস্ত দপ্তরে সময়ানুবর্তিতার কড়া নির্দেশ
    এই সময় | ১৩ মে ২০২৬
  • এই সময়: নতুন সরকারের অভিমুখ কী হবে, দায়িত্ব িনয়েই তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর দেখানো পথেই যে সরকার পরিচালিত হবে, মঙ্গলবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা আরও একবার তা পরিষ্কার করে দিলেন সদ্য নিযুক্ত মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল। এ দিন সব দপ্তরের সচিবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে মুখ্যসচিব ভয়হীন ভাবে কাজ করার বার্তা দেন আমলাদের। সূত্রের দাবি, বৈঠকে তিনি বলেন, ‘শিরদাঁড়া শক্ত করে কাজ করুন।’ মনোজ স্পষ্ট করে দেন, এই সরকার চলবে কেবল নিয়মের ভিত্তিতে। সরকারি রুল বুকই এ ক্ষেত্রে গীতা-বাইবেল-কোরান। একই সঙ্গে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ফেরানোর বার্তাও দেন। ফেরানো হয় আগের ১০টা–৫টা ডিউটির নিয়ম।

    সোমবারই মুখ্যসচিবের দায়িত্ব নিয়েছেন মনোজ। মঙ্গলবার সব দপ্তরের সচিবদের বৈঠকে ডাকেন তিনি। মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যে পালাবদলের পরে যাতে সরকার মসৃণ ভাবে চলে। সূত্রের দাবি, এ দিনের বৈঠকে মনোজ প্রথমেই জানিয়ে দেন, প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ফেরাতে হবে। নতুন জমানায় কাজ হবে কেবল নিয়মের ভিত্তিতে। তার পরেই অফিসারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলব, শিরদাঁড়া শক্ত করে কাজ করুন। কাজ করলে শিরদাঁড়া বাঁকাতে হয় না। আপনারা আইএএস অফিসার, নিজের দায়িত্ব পালন করে যান।’

    মনোজের বৈঠক শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজ্যের আইন দপ্তর থেকে নির্দেশিকা জারি করা হয়, সরকারি কর্মীদের সকাল ১০.১৫–এর মধ্যে অবশ্যই অফিসে ঢুকতে হবে। আর বিকেল সওয়া ৫টার আগে কোনও ভাবেই অফিস ত্যাগ করা যাবে না। এই নিয়ম বরাবরই চালু ছিল। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছিল না বলে নজরে আসে সরকারের। সেই জন্য ওই নির্দেশ ভালো ভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হলো সরকারি কর্মচারীদের। শুধু আইন দপ্তর নয়, সবক’টি দপ্তরেই এই নির্দেশিকা কার্যকর করা হবে।

    রাজ্য প্রশাসন সূত্রের খবর, এ দিনের বৈঠকে মুখ্যসচিব নির্দেশ দেন, কেন্দ্রীয় সরকারের যে সমস্ত প্রকল্প রাজ্যে এতদিন থমকে ছিল, তা দ্রুত চালু করতে হবে। বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহার— ‘সংকল্পপত্র’র ঘোষণাগুলি বাস্তবায়নে প্রতিটি দপ্তরকে দ্রুত পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। অর্থ অপচয় বন্ধ করে রাজস্ব বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। সোমবারই নবান্ন থেকে জেলা প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারদের উদ্দেশে তাঁর নির্দেশ ছিল, গোরু পাচার, কয়লা ও বালি পাচার নিয়ে ‘জি়রো টলারেন্স’ নীতি নিতে হবে। প্রোমোটারির ক্ষেত্রে কোনও সিন্ডিকেট রাজ বা তোলাবাজি চলবে না।

    এ দিনও সেই নির্দেশগুলিকে আরও একবার মনে করিয়ে দেন মুখ্যসচিব। মনোজের স্পষ্ট বার্তা, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মতো সরকারি জমি জবরদখল রুখতে হবে এবং যে কোনও বেআইনি নির্মাণ দেখামাত্রই ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলাশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিধায়করা শপথ নেওয়ার পরেই তাঁদের এবং পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে থমকে থাকা প্রকল্পের কাজগুলি চালু করতে হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন সরকার তৈরি হওয়ার পর থেকেই আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মুখ্যসচিবের ‘শিরদাঁড়া’ তত্ত্ব এবং মুখ্যমন্ত্রীর ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’— এই দুই বার্তাই আদতে বিগত জমানার আধিকারিকদের একাংশের প্রতি এক প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন প্রশাসনিক মহলের অনেকে।

    সামাজিক প্রকল্পে ভাতা বৃদ্ধির কারণে এই সরকারের আর্থিক দায়ভার অনেকটাই বাড়ছে। তার পরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পও রয়েছে। ফলে অর্থের সংস্থান বড় চিন্তা। তা ছাড়া পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের জমানায় প্রায় ৭ লক্ষ ৭১ হাজার কোটি টাকা ঋণের বোঝাও রয়েছে। সেই বিষয়টি কী ভাবে মোকাবিলা করবে সরকার? এই প্রশ্নে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখ্যসচিব বলেন, ‘সেটা আমরা নিশ্চয়ই দেখব। রাজস্ব আদায় বাড়াব। খরচ কিছু কমাব। অর্থ দপ্তরের সচিব-সহ সবার সঙ্গে বৈঠক হবে। আমরা পেপার দেখব। কোনও একটা পথ আমরা বের করবই। জনগণের জন্য আমাদের এখন কাজ করতে হবে। আমরা তা করবই।’

    নতুন সরকারের মুখ্যসচিব হিসেবে কী পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর? এই প্রশ্নে মনোজ বলেন, ‘নতুন সরকার তো প্রত্যেক ৫ বছর অন্তর হয়। কিন্তু, ৫০ বছর পর এমন সরকার এসেছে, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল রয়েছে। জনসাধারণের আশা, অনেক পরিবর্তন হবে। এখন সরকারকে আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে আসল পরিবর্তন করতে হবে।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখ্যসচিবের সংযোজন, ‘আগামী ১০০ দিনে সংকল্পপত্রে যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সরকারের তরফে, সেই সব সংকল্প পূরণ করা হবে।’

    স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে যা যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা যাঁরা অমান্য করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যসচিবের কথায়, ‘গতকাল মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি একটা মুক্ত, পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে চান। আমি সব লেভেলে মিটিং করব। সব লেভেলে আমার বার্তা পৌঁছে দেবো। তারপরেও যদি কেউ তা অমান্য করার চেষ্টা করেন, তা হলে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

    ৬০ বছর বয়স পার করার পরেও যাঁরা পূর্ববর্তী সরকারের জমানায় নিয়োগ পেয়েছিলেন অথবা যাঁদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে মনোনীত করা হয়েছিল, তাঁদের চাকরি থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সোমবারই। সেই তালিকাভুক্ত ২৪৩ জন গ্রুপ–এ অফিসারদের লিস্ট মঙ্গলবার প্রকাশ করা হয়। মূলত গত এক দশকে তৃণমূল জমানায় যে সমস্ত আইএএস, আইপিএস বা ডব্লিউবিসিএস অফিসারদের অবসরের পরে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল, তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশের প্রেক্ষিতেই এই তালিকা। এই তালিকায় রাজ্যের অর্থ দপ্তর, শিক্ষা দপ্তর, ভূমি দপ্তর থেকে শুরু করে ক্রীড়া, স্বাস্থ্য, শ্রম, খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকেরা রয়েছেন।

  • Link to this news (এই সময়)