এই সময়, বর্ধমান ও কাটোয়া: অবৈধ ভাবে গোরু পাচার রুখতে পূর্ব বর্ধমান জেলার দুই প্রান্তে পুলিশের তৎপরতা এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের ছবি ধরা পড়ল। বর্ধমান শহর এবং কাটোয়া এই দুই এলাকা থেকে মোট ২৭টি গোরু বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বৈধ কাগজপত্র বা 'লাইভস্টক পারমিট' ছাড়া গোরু কোথাও নিয়ে যাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
মঙ্গলবার গভীর রাতে বর্ধমান থানার বাদামতলা জিটি রোড এলাকা দিয়ে গোরু নিয়ে যাওয়ার সময়ে সন্দেহ হওয়ায় কয়েকজন ব্যক্তি পুলিশে খবর দেন। বর্ধমান থানার টহলদারি ভ্যান ঘটনাস্থলে পৌঁছে দু'জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঝাড়খণ্ড থেকে গোরুগুলি নিয়ে আসা হচ্ছিল কাটোয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিক্রির উদ্দেশ্যে। কিন্তু ২২টি গোরুর বিপরীতে কোনও বৈধ নথিপত্র দেখাতে না-পারায় পুলিশ গোরুগুলি বাজেয়াপ্ত করে এবং শেখ রফিকুল ইসলাম ও মিন্টু শেখ নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ধৃতদের মঙ্গলবার বর্ধমান সিজেএম আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক তাঁদের সাত দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।
আদালতে নিয়ে যাওয়ার পথে ধৃত শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, 'আমরা বহুদিন ধরে গোরুর পাইকারি ব্যবসা করি। এক জায়গায় কিনে অন্য জায়গায় বিক্রি করে কিছু টাকা লাভ হয়। কাগজপত্র সে ভাবে কিছু থাকে না কোনওদিনই। যার কাছে কিনি তার একটা কাগজ থাকে কিনলাম বলে। এখন এ সব হলে আর ব্যবসা করব না।'
অন্য দিকে, জেলা পুলিশের এক আধিকারিকের বক্তব্য, 'বিভিন্ন হাটে গোরু নিয়ে যারা ব্যবসা করেন সেই সব হাট মালিকদের সঙ্গে আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আলোচনায় বসছি। কোনও ভাবে কাগজপত্র ছাড়া গোরু নিয়ে যাওয়া যাবে না, এটা প্রাথমিক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্ধমানে যে দু'জনকে গোরু সমেত ধরা হয়েছে তাদের কাগজপত্রের কোনও বৈধতা ছিল না বলেই আমরা তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছি। একবারে লাইভস্টক পারমিটের যে আইন রয়েছে, সেই আইন মেনে গোরু নিয়ে যেতে হবে। একটা ছোট গাড়িতে ২০-২৫টা গোরু ভরে দিয়ে নিয়ে যাওয়া আর হবে না।'
এ দিনই কাটোয়ার মাধাইতলা এলাকায় গোরু পাচারের অভিযোগে চার ব্যক্তিকে হাতেনাতে ধরে ফেলে স্থানীয় বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। পাঁচটি গোরুকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁদের কাছে বৈধ নথি চাওয়া হলে তাঁরা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। অভিযোগ, এর পরেই উত্তেজিত জনতা তাঁদের বেধড়ক মারধর শুরু করে। খবর পেয়ে কাটোয়া থানার পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী এসে চার জনকে আটক করে। ধৃতদের নাম রহিম শেখ, সালাম আনসার, সুজাউদ্দিন শেখ ও শেখ মহিদুল্লা। রহিমের বাড়ি খাজুরডিহি গ্রামের মাঠপাড়াতে। সালামের বাড়ি গাঙ্গুলিডাঙার কদমপুকুর এলাকায়। বাকি দু'জনের বাড়ি নদিয়া জেলার নাকাশিপাড়া এলাকায়। ধৃতরা জানান, তাঁরা গোরুগুলি ভাগীরথী পেরিএ নদিয়ায় নিয়ে যাচ্ছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ধৃতরা কখনও গোরু কেনাবেচার ব্যবসা, আবার কখনও পশুপালনের কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। এই বিষয়ে কাটোয়ার বিজেপি নেত্রী সীমা ভট্টাচার্য বলেন, 'গোরুগুলি পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমরা তা আটকে দিয়েছি।' পুলিশ বর্তমানে এই চার জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
জেলা জুড়ে এই অভিযানের পরে পশু পরিবহণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরও বাড়ানো হয়েছে। নথিপত্রহীন এবং অমানবিক উপায়ে গোরু পারাপারের বিরুদ্ধে প্রশাসন যে আপসহীন অবস্থানে রয়েছে, তা এই দুই ঘটনাই স্পষ্ট করে দিল।