• ট্যুরিজ়মের ‘স্ট্রেস’! বন্ধ্যত্বের শিকার বাঘিনি
    এই সময় | ১৩ মে ২০২৬
  • শিলাদিত্য সাহা

    আধুনিক যুগের ক্যান্সার কী জানো? স্ট্রেস! লাগামছাড়া স্ট্রেস। ভারতে সিনেমার ইতিহাসে রীতিমতো মোড় ঘোরানো ছবি ‘ভিকি ডোনার’–এ ইনফার্টিলিটি এক্সপার্ট ডক্টর চাড্ডার সংলাপেই দেশের আম আদমি সহজ ভাষায় জেনেছিল, মানুষের মনে জমে থাকা অপরিসীম স্ট্রেস কী ভাবে তাদের ক্রমশ সাময়িক বন্ধ্যত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু সে তো ছিল মানুষের কথা। ডেডলাইন, চাকরি, সংসার, সম্পর্ক — নানা চিন্তায় জর্জরিত। কে জানত, জঙ্গলের বাঘেরাও একই ভাবে সংক্রমিত হয়ে পড়ছে আধুনিক যুগের এই ক্যান্সারে?

    অথচ ঠিক এমনটাই ঘটছে। দেশের বিভিন্ন টাইগার রিজ়ার্ভে মাত্রাছাড়া পর্যটন এবং বাঘের জঙ্গলে মানুষের অবাধ যাতায়াতে গভীর ভাবে মানসিক চাপে পড়ছে বাঘ। অতিসম্প্রতি বিজ্ঞানপত্রিকা ‘জ়ুলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন জার্নাল অ্যানিম্যাল কনজ়ারভেশন’–এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষা বলছে, বাঘের জঙ্গলে কোর ও বাফার এরিয়ায় বিপুল পর্যটক নিয়ে টাইগার সাফারির জেরে বাঘের স্ট্রেস বাড়ছে চরম ভাবে। একই ভাবে স্ট্রেস বাড়াচ্ছে জঙ্গল ঘিরে চলা বিভিন্ন ‘অ্যানথ্রোপোজেনিক অ্যাক্টিভিটিজ়’, যার মধ্যে চাষাবাদ, পশুপালন, রাস্তা নির্মাণ থেকে বনে কাঠ বা কেন্দুপাতা সংগ্রহে যাওয়া — সবটাই পড়ছে। ভারতে জঙ্গলের বাঘের স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এটিই প্রথম সমীক্ষা।

    ২০২০ থেকে ২০২৩ — তিন বছরে দেশের পাঁচটি টাইগার রিজ়ার্ভে (করবেট, তাডোবা–আন্ধেরি, কানহা, বান্ধবগড়, পেরিয়ার) ছ’শোর উপরে বাঘের উপর সমীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যেখানে টাইগার সাফারি বেশি, সেখানে বাঘের স্ট্রেসও বেশি। আর সেই স্ট্রেসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাঘিনিদের শরীরে থাকা হরমোনে, যা আদতে তাদের ফার্টিলিটি বা প্রজনন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। জঙ্গলের বাফার থেকে কোর — সর্বত্রই বাঘেদের মধ্যে এই স্ট্রেস এবং সাময়িক বন্ধ্যত্বের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকী, শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ ফিট প্রজননক্ষম বাঘিনিও সন্তানধারণ করতে পারছে না স্রেফ ন্যুনতম প্রাইভেসির অভাবে। তাদের ঋতুচক্র (Estrous cycle) চলছে, বাঘ–বাঘিনি মিলনও হচ্ছে। কখন‍ও বাঘিনি গর্ভধারণও করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সন্তানপ্রসবের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত যাচ্ছে না।

    সমীক্ষক দলের অন্যতম সদস্য, হায়দরাবাদের ‘সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি’ বা সিসিএমবি–র বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণ বিভাগের চিফ সায়েন্টিস্ট গোবিন্দস্বামী উমাপতি জানাচ্ছেন, টানা তিন বছরের এই সমীক্ষায় ২৯১টি বাঘিনি এবং ১৮৫টি বাঘের স্ক্যাট স্যাম্পল (মলের নমুনা) নিয়ে তাঁরা গবেষণায় দেখেছেন, জঙ্গলের বাফার জ়োনের তুলনায় কোর এরিয়ার বাঘেরা অনেক বেশি স্ট্রেসের শিকার। কারণ বাফার এরিয়ায় বাঘেরা তা–ও সারাদিনের অনেকটা সময়ে মানুষের দেখা পেতে, রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাওয়া দেখতে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার দূষণের মাত্রার সঙ্গে পরিচিত। তাতে মানসিক চাপ তৈরি হলেও পারস্পরিক সহাবস্থানের তত্ত্বে বাঘেরা তা নিয়েই বড় হচ্ছে। কিন্তু জঙ্গলের আপাত শান্ত ও নির্ঝঞ্ঝাট কোর এরিয়া — যেখানে ট্যুরিস্ট সিজ়নে দিনে চার বার সাফারির জন্য বিপুল সংখ্যক গাড়ি ও পযর্টক ঢুকছে, সেখানকার বাঘেদের কার্যত দিশাহারা অবস্থা।

    গোবিন্দস্বামী জানাচ্ছেন, দেশের পাঁচটি জঙ্গল থেকে যে ৬১০টি স্যাম্পল তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে দুটি প্রধান হরমোন মার্কারের মাধ্যমে। প্রথমে ব্যবহার করা হয়েছে ফিকাল গ্লুকোকর্টিকয়েড মেটাবলাইটস (faecal glucocorticoid metabolites) যা স্ট্রেস বোঝার বায়োমার্কার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর কাজে এসেছে ফিকাল প্রোজেস্টেরন মেটাবলাইটস (faecal progesterone metabolites) যার মাধ্যমে বাঘিনিদের প্রজননগত কার্যকলাপের হদিশ মেলে। করবেট, তাডোবা–আন্ধেরি, কানহা, বান্ধবগড় ও পেরিয়ার — উত্তরাখণ্ড, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও কেরালায় বাঘ পর্যটনের জন্য এই বিখ্যাত এই জঙ্গলগুলো থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সব ক্ষেত্রেই ট্যুরিজ়ম এরিয়া বা সাফারি রুটের কাছাকাছি থাকা বাঘের শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটা বেশি। কোর এরিয়ার বাইরে জঙ্গল লাগোয়া বসতি বা রাজ্য–জাতীয় সড়ক ঘেঁষা এলাকার বাঘের জীবনও বাড়াবাড়ি রকমের ‘স্ট্রেসফুল’।

    সমীক্ষা বলছে, প্রজননের জন্য বাঘিনিরা একটু ফাঁকা জায়গা খোঁজে। কিন্তু জঙ্গলের গভীরেও বছরের ৯টা মাস পর্যটনের দাপটে সেই ফাঁকা জায়গা ক্রমশ কমছে। গোবিন্দস্বামীর কথায়, ‘আমরা সরাসরি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি, যে বাঘের জঙ্গলে দিনে তিনটে সাফারিতে ২০টা করে মোট ৬০টা গাড়ি ঢোকে, সেখানে কী ভাবে স্ট্রেস তৈরি হয়। ২০টা গাড়ি ঢোকা জঙ্গলে বাঘেদের স্ট্রেস হরমোন যে লেভেলে রয়েছে, দেখা যাচ্ছে দিনে ৪০ বা ৬০টা সাফারি গাড়ি ঢোকার জঙ্গলের কোর এরিয়ায় বাঘের শরীরে সেই স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অনেকটাই বেশি। শুধু তো কোর নয়, বাফার দিয়েও তো অনবরত গাড়ি যাচ্ছে। কোর–বাফার ফারাকটা মানুষের কাছে। বাঘের কাছে সবটাই জঙ্গল।’

    না। দেখা যাচ্ছে, তাডোবা–আন্ধেরি এবং করবেট ন্যাশনাল পার্কে নন ট্যুরিস্ট সিজ়নেও বাঘের স্ট্রেসের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, এর কারণ জঙ্গলে বাঘের বিপুল সংখ্যা এবং টেরিটোরিয়াল ফাইট। নিজের হোম রেঞ্জ বাঁচাতে রীতিমতো লড়তে হচ্ছে বাঘেদের। ফলে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাও বাড়ছে, আটকানো যাচ্ছে না সাময়িক বন্ধ্যত্ব।

    বিশ্বের মোট রয়্যাল বেঙ্গলের ৭৫‍% ধারণ করে ভারত। খাতায়কলমে বাঘের সংখ্যা চার হাজারের কাছাকাছি। আর পর্যটক? বছরের হিসেবে ২০১৫ সালে দেশের সব অভয়ারণ্য মিলিয়ে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১৪ লক্ষের মতো। ২০০৫–এর ১০ লক্ষ পর্যটকের তুলনায় যা অনেকটা বেশি। কিন্তু ২০২৫–এর পরিসংখ্যান বলছে, শুধু রণথম্ভোর এবং পেরিয়ারের জঙ্গলেই গিয়েছেন অন্তত ১৩ লক্ষ পর্যটক! দেশে বাঘের জঙ্গল এখন ৫৮টি। মাত্র দু’টিতেই যদি ১৩ লক্ষ পর্যটকের ভিড় হয়, সব মিলিয়ে সংখ্যাটা কোথায় যেতে পারে তবে!

  • Link to this news (এই সময়)