• একসঙ্গে সক্রিয় ১০টি ওয়েদার সিস্টেম, দেশে গরমও মনোরম
    এই সময় | ১৩ মে ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    চেন্নাই উপকূলের কাছে একটি নিম্নচাপ, দেশের উত্তর–পশ্চিমে সক্রিয় পশ্চিমি ঝঞ্ঝা, বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হওয়া চারটি ঘূর্ণাবর্ত এবং চারটি নিম্নচাপ অক্ষরেখা — একযোগে সক্রিয় দশটি 'ওয়েদার সিস্টেম' মে–র দ্বিতীয় সপ্তাহেও গোটা দেশের গড় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। একই সঙ্গে এই ওয়েদার সিস্টেমগুলির প্রভাবে ১২ মে পর্যন্ত ভারত স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টি পেয়েছে বলে জানাচ্ছে মৌসম ভবন।

    ২০২৬–কে 'সুপার এল নিনিও'–র (নিনিও, নিনো নয়) বছর হিসেবে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আবহবিদরা। আশঙ্কা করা হয়েছিল, অতি শক্তিশালী এল নিনিও–র প্রভাবে এ বছর ভারতীয় উপমহাদেশে মে–জুলাই সময়সীমায় গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি থাকবে। জুন–সেপ্টেম্বরের চার মাসে বর্ষার পরিমাণও স্বাভাবিকের নীচে থাকতে চলেছে। কিন্তু মে–র দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। শুধু বাংলার আবহাওয়ার নিরিখে বলা যায়, এ বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর পার করেছে মাত্র ন'দিন। এই ন'টি দিনই এপ্রিলে। মে পড়ার পর থেকে গরমের অনুভূতি এখনও টের পায়নি বাংলা। এই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আন্দামান সাগরে নতুন করে একটি নিম্নচাপ তৈরিরও সম্ভাবনা রয়েছে। তেমন হলে ফের মে–র ২০–২১ তারিখ থেকে বৃষ্টি শুরু হতে পারে দক্ষিণবঙ্গে। তবে তার দিন দশেক আগেই দেশের আবহাওয়া মানচিত্র রীতিমতো বৈচিত্রময় হয়ে উঠেছে।

    মৌসম ভবন জানিয়েছে, ৮ মে বিহারের পাটনার আশপাশে ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে ঝোড়ো হাওয়া রেকর্ড করা হয়েছে। ৯ মে জম্মু ও কাশ্মীরের কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকায় তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছে। ১০ মে থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাব শুরু হয়েছে এবং ১১ মে মান্নার উপসাগর ও সংলগ্ন শ্রীলঙ্কা অঞ্চলে একটি নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। এই নির্দিষ্ট ঘটনাগুলি ছাড়াও গত কয়েক দিনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভারী বৃষ্টি (৭–১১ সেমি), বজ্রবিদ্যুৎ–সহ ঝড়, শিলাবৃষ্টি, প্রবল গতিতে বয়ে যাওয়া হাওয়া, তাপপ্রবাহ, তীব্র তাপপ্রবাহ, উষ্ণ রাত এবং অত্যন্ত উষ্ণ রাতের মতো নানা ধরনের আবহাওয়াগত পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে।

    মার্চ থেকেই দেশের বহু অঞ্চলে নিয়মিত ভাবে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটারেরও বেশি গতির হাওয়া রেকর্ড করা হয়েছে। সমুদ্রের উপর দিয়ে এমন গতিতে হাওয়া দিলে সেটি 'তীব্র ঘূর্ণিঝড়'-এর সমতুল্য গণ্য হয়। কোনও জায়গায় দিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এবং সেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৬ ডিগ্রি উপরে থাকলে তাকে 'তাপপ্রবাহ' এবং দিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির চেয়ে বেশি ও সেটি স্বাভাবিকের চেয়ে ৬.৪ ডিগ্রি বেশি থাকলে তাকে 'তীব্র তাপপ্রবাহ' বলা হয়।

    অন্য দিকে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৬ ডিগ্রি বেশি হলে তাকে 'উষ্ণ রাত' এবং স্বাভাবিকের ৬.৪ ডিগ্রি উপরে থাকলে তাকে 'অত্যন্ত উষ্ণ রাত' বলা হয়।

    মৌসম ভবনের তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত সময়ে গোটা দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে গুজরাটে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩১৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে — দেশের মধ্যে সর্বাধিক। এর পরেই রয়েছে বিহার। সেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির পরিমাণ ১৮০ শতাংশ। একই সময়ে উত্তরপ্রদেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৪৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

    আবহবিদরা জানাচ্ছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আসার আগেই এত বৈচিত্রময় আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং তার নেপথ্যে সক্রিয় 'ওয়েদার সিস্টেম'–গুলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, উষ্ণতা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার প্রবাহ এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের মধ্যে এমন একটা জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে যার ফলে বহু অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও কমেছে এবং প্রত্যাশিত ব্যাপক তাপপ্রবাহের বদলে এবারের গ্রীষ্ম অনেকটাই স্বাভাবিকের তুলনায় শীতল থেকেছে। কত দিন এমন থাকে, সেটাই দেখার।

  • Link to this news (এই সময়)