দু’বছর আগের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় সামান্য ভোট কমেছে। তবে আসনের নিরিখে এ বার কেটে গিয়েছে শূন্যের গেরো। বিধানসভা ভোট থেকে দলের প্রাপ্তির খাতায় তেমন কিছু না-উঠলেও রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে ভবিষ্যতের জন্য আশা দেখছে সিপিএম। একই মত তাদের সমঝোতার সঙ্গী ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টও (আইএসএফ)। পরবর্তী উপনির্বাচনকে মাথায় রেখে রাজ্যের বিরোধী পরিসরে জমি বিস্তারের ভাবনাও শুরু করে দিয়েছে তারা।
রাজ্যে ২০২১ সালের বিধানসভা ও ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে শূন্য হাতে ফেরার পরে এ বার সিপিএমকে জয়ের স্বাদ এনে দিয়েছেন ডোমকলে মুস্তাফিজুর রহমান (রানা)। আর ভাঙড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সওকাত মোল্লাকে হারিয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য বিজয়ী হয়েছেন আইএসএফের চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকী। গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় এক শতাংশ ভোট কমেছে সিপিএমের। এ বার তারা পেয়েছে ২৮ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬৭ ভোট, ষা ৪.৪৫%। ডোমকলের পাশেই জলঙ্গি কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে সিপিএম। আইএসএফ দ্বিতীয় হয়েছে চারটিতে, তাদের তৃতীয় স্থান রয়েছে ২২টি আসনে। পক্ষান্তরে, একা লড়ে কংগ্রেস মুর্শিদাবাদ জেলারই দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে, দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে ৬টি কেন্দ্রে। সিপিএমের চেয়ে বেশি আসন পেলেও কংগ্রেসের বাক্সে পড়েছে ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার ৮৫৮ ভোট (২.৯৭%)।
কিন্তু ভোটের এই চুলচেরা হিসেবের চেয়েও সিপিএমের ভাবনায় বেশি করে রয়েছে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি। দীর্ঘ দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে দুই শক্তিধর প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির বিরুদ্ধে একই সঙ্গে লড়াই চালাতে হয়েছে বামেদের। তৃণমূল-বিরোধিতার মাত্রা কেন বেশি, বিজেপি-বিরোধিতা কেন কম, তার মাপ ধরে নানা বিতর্ক হয়েছে বারবার! বামেদের নিচু তলার বড় অংশেরই মনোভাব তীব্র তৃণমূল-বিরোধী। সেই নিচু তলার উল্লেখযোগ্য অংশ তৃণমূলের হাতে ‘আক্রান্ত’ হয়ে বিজেপির দিকে চলে গিয়েছে। কেউ সরাসরি বিজেপি শিবিরে নাম লিখিয়েছেন, অন্য একাংশ আবার বাম সংগঠন করেও ভোট অন্যত্র দিয়েছেন। একই ভাবে বামেদের সংখ্যালঘু সমর্থনের কিছুটা সরে গিয়েছে তৃণমূলের দিকে। এ বার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূলের প্রতাপ কমতে শুরু করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে বিরোধী পরিসরে প্রাসঙ্গিক হতে চাইছে সিপিএম। প্রসঙ্গত, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে একাধিক লেনিন মূর্তিতে যেমন ভাঙচুর হয়েছে, তেমনই আবার নানা জেলায় তৃণমূলের হাতে দখল হয়ে থাকা একশো’র বেশি কার্যালয় সিপিএম পুনরুদ্ধার করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের প্রাথমিক পর্যালোচনা হয়েছে দিল্লিতে সিপিএমের পলিটব্যুরোর দু’দিনের বৈঠকে। পরে দলের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি বলেছেন, ‘‘বাংলায় এ বার আমরা অনেক বেশি লাল ঝান্ডা দেখতে পেয়েছি, প্রচারে উৎসাহও ছিল বিপুল। এই উৎসাহের সবটা যে ভোট-বাক্সে যেতে না-ও পারে, সেই ধারণাও আমাদের ছিল। তবে এখনও সেখানে লড়াইয়ের জায়গা আছে। সাধারণ মানুষ ও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিধানসভায় বামপন্থী ও সহযোগী দলের প্রতিনিধিও থাকবেন।’’
সদ্যজয়ী সিপিএম বিধায়ক মুস্তাফিজুরের মতও তা-ই। তাঁর বক্তব্য, ‘‘বামপন্থীরা চির কালই নানা আক্রমণের মোকাবিলা করে আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করে এসেছে। এখনও হামলা এবং নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে আমাদের পড়তে হবে। কিন্তু তৃণমূল দুর্বল হয়ে যাওয়ায় একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। পাশাপাশিই, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল সব শক্তিকে একজোট করতে হবে।’’ আইএসএফের নওসাদের কথায়, ‘‘পরিস্থিতি কাজে লাগাতে দেরি না-করে এখন থেকেই আমাদের সক্রিয় হতে হবে।’’
বিধায়কেরা যে পথের কথা বলছেন, সেই সূত্র নিয়েই ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে বাম শিবিরে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম এবং হুমায়ুন কবীর রেজিনগর ছেড়ে দিলে ওই দুই বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে। তার পাশাপাশি অনেক দিন বকেয়া থাকা বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রেও উপনির্বাচনের সম্ভাবনা। বসিরহাট আইএসএফ-কে ছেড়ে নন্দীগ্রামে বাম এবং রেজিনগরে সমঝোতার জন্য কংগ্রেসকে প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। বিধানসভার ফলপ্রকাশের পরে সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে ১৬-১৭ মে, সেখানে বেবির থাকার কথা।
তবে ভবিষ্যতের জন্য লড়াইয়ের রসদ পেলেও তরুণ প্রজন্মের মুখেদের বারবার ভোটে হার হতাশাও তৈরি করেছে সিপিএমে। পরাজিত তরুণ নেতা-নেত্রীদের কয়েক জনকে ওই এলাকাতেই দলের স্থানীয় কমিটির সঙ্গে সংযোগ রেখে চলার বার্তা দেওয়া হয়েছে। যেমন, উত্তরপাড়ায় হেরে গেলেও মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের হাতে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে হুগলি জেলার দায়িত্ব যোগ করা হয়েছে। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্যের মতে, ‘‘বিজেপির আগ্রাসন নিয়ে কোনও সংশয় নেই, আক্রমণ থেকে আমাদের রেহাই পাওয়ার বাড়তি আশাও নেই। তবে এ বার সরাসরি যুদ্ধ হবে এবং মতাদর্শগত লড়াইয়ের উপরে জোর দেওয়া যাবে।’’