মোহনবাগানের ‘অভিভাবক’ টুটু বসুর প্রয়াণ, শোকের ছায়া ভারতীয় ফুটবলে
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৩ মে ২০২৬
শেষ হলো এক দীর্ঘ লড়াই। ময়দান হারাল তার অন্যতম প্রিয় ‘অভিভাবক’কে। প্রয়াত হলেন মোহনবাগানের প্রাক্তন সভাপতি স্বপনসাধন বসু, যিনি ক্রীড়াজগতে ‘টুটু বসু’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান এই ক্রীড়া প্রশাসক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
দীর্ঘ দিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন টুটু বসু। সোমবার সন্ধ্যায় আচমকা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দক্ষিণ কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভেন্টিলেশন সাপোর্টেও রাখা হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরবিদায় নেন তিনি।
তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে যান কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক এবং সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
১৯৯১ সাল থেকে প্রায় তিন দশক ধরে মোহনবাগান ক্লাব প্রশাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন টুটু বসু। ক্লাবের কঠিন সময়েও তিনি যেভাবে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তা আজও স্মরণ করেন সবুজ-মেরুন সমর্থকেরা। ময়দানে ‘অজাতশত্রু’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। শুধু মোহনবাগান নয়, ইস্টবেঙ্গল এবং মহমেডান শিবিরেও সমান সম্মান পেতেন টুটুবাবু।
টুটু বসুর হাত ধরেই মোহনবাগান আধুনিক পেশাদার ফুটবলের পথে এগিয়ে যায়। তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই ক্লাবের ইতিহাসে আসে একাধিক যুগান্তকারী পরিবর্তন। শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কার হাতে ক্লাবের অংশীদারিত্ব তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন ছিল সাহসী পদক্ষেপ, তেমনই বিদেশি ফুটবলার চিমা ওকেরিকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তও ভারতীয় ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। মোহনবাগানের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি ফুটবলার হিসেবে চিমার আগমন সে সময় ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছিল।
শুধু ক্রীড়া প্রশাসক হিসেবেই নয়, টুটু বসুর পরিচয় ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন, সংবাদপত্রের মালিক ছিলেন, পাশাপাশি রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীর্ঘদিন শারীরিক সমস্যার কারণে হুইলচেয়ারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেই কারণে গত কয়েক বছরে সক্রিয় প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে খানিক দূরে থাকলেও, মোহনবাগান সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ক্লাবের অন্যতম অভিভাবক।
গত বছর মোহনবাগান দিবসে তাঁকেই দেওয়া হয়েছিল ‘মোহনবাগান রত্ন’ সম্মান। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই সম্মান প্রবর্তনের নেপথ্যেও ছিল তাঁর উদ্যোগ। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, বাইচুং ভুটিয়া, আই এম বিজয়ন, জোসে ব্যারেটো এবং সুব্রত ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে সেই সম্মান গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
বুধবার সকালে তাঁর মরদেহ মোহনবাগান ক্লাব প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হবে বলে জানা গিয়েছে। সেখানে সমর্থক, প্রাক্তন ফুটবলার এবং ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা তাঁদের প্রিয় ‘টুটুদা’-কে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন।
টুটু বসুর প্রয়াণে শুধু মোহনবাগান নয়, গোটা ভারতীয় ফুটবল হারাল এক দূরদর্শী সংগঠককে। ময়দানের এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল তাঁর বিদায়ে।