প্রশ্ন ফাঁস, বাতিল নিট! ১৭ জন গ্রেপ্তার, বারবার অনিয়ম কেন, ক্ষুব্ধ লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া
বর্তমান | ১৩ মে ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ! তার জেরে আচমকাই চলতি বছরের ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিল মোদি সরকার। গত ৩ মে নিট-ইউজি হয়েছিল সারা দেশে। ন’দিন পর, মঙ্গলবার সকালে সেই পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা করল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। এর ফলে প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল প্রায় ২২ লক্ষ ৫ হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। প্রবল চাপের মুখে এনটিএর ডিরেক্টর জেনারেল অভিষেক সিং অবশ্য জানিয়েছেন, পরবর্তী ৭-১০ দিনের মধ্যে রি-এগজামিনেশনের দিনক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হবে। কোনো পরীক্ষার্থীকে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে না। নতুন করে রেজিস্ট্রেশনও করতে হবে না। যদিও এনটিএর বিরুদ্ধে অসন্তোষ কোনোমতেই কমছে না।
বারবার এমন অনিয়ম হচ্ছে কেন? ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া। ইতিমধ্যেই প্রশ্ন ফাঁস কাণ্ডের তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়েছে সিবিআইয়ের হাতে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানের শিক্ষা-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে। তদন্তকারীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে এপর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই কাণ্ডের অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ও রয়েছে সেই তালিকায়। বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভ চরমে উঠেছে। সরব হয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল, আপের মতো একাধিক রাজনৈতিক দল। দিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রকের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছে সিপিএম ও কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এসএফআই ও এনএসইউআই। প্রশ্ন ফাঁসের কড়া নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে এবিভিপিও।
জানা যাচ্ছে, এনটিএ গঠনের পর থেকে এনিয়ে মোট ১৬ বার একাধিক কারণে বিভিন্ন পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে সংস্থাটিকে। পরীক্ষা বাতিল নিয়ে এদিন দিল্লিতে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তবে কেন্দ্রীয় শিক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ‘বর্তমান’কে জানিয়েছেন, দোষীদের কাউকে ছাড়া হবে না। এনটিএ’র অবশ্য দাবি, সুরক্ষা ব্যবস্থায় ফাঁক ছিল না। নিরাপত্তাজনিত যাবতীয় প্রোটোকল মেনে জিপিএস-ট্র্যাকড গাড়িতে করেই প্রশ্নপত্র আনা হয়েছিল। ব্যবহার করা হয়েছিল ‘ওয়াটারমার্ক আইডেন্টিফায়ার’ও। সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে এআই-ভিত্তিক সিসিটিভি মনিটরিংয়ের বন্দোবস্ত ছিল পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে। প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন হয়েছে। কাজে লাগানো হয়েছে ফাইভ-জি জ্যামারও।
এমন বজ্র আঁটুনি নিরাপত্তা থাকলে কীভাবে ফাঁস হল প্রশ্নপত্র? এনটিএ জানিয়েছে, গত ৭ মে সন্ধ্যায় একজন ‘হুইসল ব্লোয়ারে’র মাধ্যমেই বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। তিনি জানান, পরীক্ষার আগে নিট-ইউজির ‘গেস পেপার’ বহুলাংশে বিক্রি করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপেও তা ছড়িয়ে পড়ে। রসায়নবিদ্যা এবং জীববিদ্যার এমন অন্তত ১২০টি থেকে ২০০টি প্রশ্ন ‘গেস পেপারে’ রয়েছে, যার সঙ্গে আসল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল রয়েছে। ৯৫-১০০ শতাংশ প্রশ্ন মিলে গিয়েছে। ৩০ হাজার থেকে ২৮ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছে ওই ‘গেস পেপার’। এই কাণ্ডের নেপথ্যে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র এবং উত্তরপ্রদেশের ওই অসাধু চক্রের খোঁজ মিলেছে। রাজস্থানের সিকর ও মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকেই গ্রেপ্তারি সবথেকে বেশি। ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে প্রশ্ন কেনার অভিযোগে নাসিকে গ্রেপ্তার হয়েছে স্নাতক স্তরের এক আয়ুর্বেদ পড়ুয়া।
প্রশ্ন ফাঁস কাণ্ডে তীব্র আক্রমণ করেছেন রাহুল গান্ধী। পড়ুয়াদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা— ‘মোদি সরকার ও বিজেপি তোমাদের ভবিষ্যৎ চুরি করছে।’ বাম দলগুলি এনটিএকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা বাংলায় এসে সমালোচনা করে গিয়েছেন। এখন ওদের কী শাস্তি হবে?