নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আগুন...আগুন! সম্মিলিত আর্তনাদ ততক্ষণে গোটা বহুতলে ছড়িয়ে পড়েছে। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছে চারপাশ। ঠিকরে বেরচ্ছে আগুনের হলকা। দোতলার চর্মশিল্পের কারখানার বেশিরভাগ কর্মী তখন নীচে খেতে গিয়েছিলেন। কারখানায় ছিলেন পাঁচজন কর্মী। আগ্রাসী আগুন থেকে বাঁচতে তাঁরা বেশ কিছুটা দূরে শৌচালয়ে ঢুকে পড়েন। সেটাই কাল হল! শৌচালয়ের ভিতরেই আটকে পড়েন তাঁরা। সেখানেই দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় দুই কর্মীর। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি বাকি তিনজন।
মঙ্গলবার দুপুরে তিলজলা থানা এলাকার তপসিয়ায় জি জে খান রোডের একটি বহুতলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বহুতলের দোতলাজুড়ে রয়েছে ‘ডেলটা লেদার্স’ নামে একটি কারখানা। এদিন বেলা পৌনে ২টো নাগাদ আচমকা সেই কারখানায় আগুন লাগে। তখন চলছিল কর্মীদের টিফিন টাইম। আগুন দেখে বহুতলের অন্যান্য তল থেকেও সবাই নেমে আসেন তড়িঘড়ি। কিন্তু ওই পাঁচজন কী করবেন না করবেন, বুঝতে না পেরে ঢুকে পড়েছিলেন কিছুটা দূরের শৌচালয়ে। বহুতলের নিজস্ব অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। তা দিয়েই প্রাথমিকভাবে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন কর্মীরা। কিন্তু, লেদার সহ নানা দাহ্য পদার্থ মজুত থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় আতঙ্ক গ্রাস করে বাসিন্দাদের। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকলের চারটি ইঞ্জিন। আগুনের উৎসস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। দমকল সূত্রে খবর, আগুনের তীব্রতা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু দোতলার কারখানায় প্রচুর পরিমাণে চামড়া মজুত থাকায় কালো ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তার সঙ্গে ছিল চামড়া পোড়ার তীব্র দুর্গন্ধ। পরিস্থিতি এমন হয় যে স্থানীয় লোকজনেরও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় দু’ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তারপরই কারখানার ভিতরে ঢুকে উদ্ধারকাজ শুরু করেন দমকলকর্মীরা। প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, কারখানায় কেউ নেই। কিন্তু শৌচালয়ের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ দেখেই সন্দেহ হয় উদ্ধারকারীদের। দরজা ভাঙতেই সামনে আসে ভয়াবহ দৃশ্য! ভিতরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছেন পাঁচজন। কারও হাত আগুনে কার্যত গলে গিয়েছে। কারও মুখ এতটাই পুড়ে গিয়েছে যে চেনা দুষ্কর। দ্রুত সবাইকে উদ্ধার করে চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দু’জনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসক। পুলিশ জানিয়েছে, রাজেট আলি মোল্লা (৩৫) ও মহম্মদ হাসানুর জামান (৪০) নামে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি তিনজনের মধ্যে মহম্মদ ইব্রার ও গৌর সর্দারের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। হাসপাতাল জানিয়েছে, অত্যধিক পরিমাণে ধোঁয়া শ্বাসনালী ও ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ায় তাঁদের অবস্থা গুরুতর হয়েছে। মহম্মদ তনভির নামে আরেক দগ্ধ কর্মীর চিকিৎসা চলছে বার্ন ইউনিটে।
ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার গোটা ঘটনার রিপোর্ট চেয়েছে। আজ, বুধবারের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে পুলিশকে। একটি এফআইআর করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিনই ঘটনাস্থল সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে আসেন কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার অশেষ বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘কীভাবে আগুন লাগল, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কারখানায় নিয়ম মেনে কাজ হচ্ছিল কি না, তারও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’ -নিজস্ব চিত্র