আলু-বলয়ে নিশ্চিহ্ন তৃণমূল! নির্বাচনী সাফল্য দেখেই আলু রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল শুভেন্দুর বিজেপি সরকার
আনন্দবাজার | ১৩ মে ২০২৬
আলুচাষের জমি থেকে ভোটর ফসল ঘরে তুলেছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের আলু-বলয় হিসাবে খ্যাত পূর্ব বর্ধমান এবং হুগলিতে ভোটের ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। তার পরেই দেখা গেল আলু রফতানি নীতিতে বদল আনল রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার। বুধবার নবান্ন থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবালকে পাশে বসিয়ে শুভেন্দু ঘোষণা করেন, আগের সরকার আলু রফতানির ক্ষেত্রে যে সব বিধি রেখেছিল, সেগুলি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘আলুচাষি এবং আলুব্যবসায়ীদের আর হয়রানির মধ্যে পড়তে হবে না।’’ রাজ্যের আলু ভিন্রাজ্যে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় তল্লাশি করত পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি দফতর। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানিয়ে দিয়েছেন, সে সব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ বা অন্য কোনও সংস্থা আলু রফতানির ক্ষেত্রে কোনও বাধা দেবে না। শুধু আলু নয়, অন্যান্য কৃষিজ পণ্য ভিন্রাজ্যে পাঠানোর ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গিতে চলবে বিজেপি সরকার।
নতুন সরকারের এই আলু রফতানি নীতি বদলকে স্বাগত জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলিও। পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আগের সরকারের ওই নীতির কারণে আমাদের নানাবিধ ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছিল। ভিন্রাজ্যে কারবার শুরু করেও বন্ধ করে দিতে হত। এখন আর সেটা হবে না। এত দ্রুত এই সরকার সিদ্ধান্ত নিল, সেটা খুবই ইতিবাচক।’’
গত কয়েক বছর ধরে হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমান হয়ে উঠেছিল তৃণমূলের দুর্গ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ব বর্ধমানের ১৬টির মধ্যে ১৬টিই জিতেছিল তৃণমূল। এ বার সেই জেলাতেই তৃণমূল সাকুল্যে পেয়েছে দু’টি আসন। একই ভাবে হুগলির ১৮টি আসনের মধ্যে গত বার তৃণমূল জিতেছিল ১৪টিতে। বিজেপির দখলে ছিল আরামবাগ মহকুমার চারটি আসন। এ বার সেই হুগলিতেই বিজেপি জিতেছে ১৬টি আসন। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো তৃণমূলের দখলে রয়েছে চণ্ডীতলা এবং ধনেখালি আসন দু’টি। এই দুই জেলায় আলুচাষ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এমন আসনের সংখ্যা ২৫টি। দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে ২১টি-ই জিতেছে বিজেপি। কিন্তু ২০২১ সালে ভোটের ফলাফল ছিল ঠিক উল্টো। এই ২৫টি আসনের মধ্যে পাঁচ বছর আগে তৃণমূল জিতেছিল ২১টি আসন। বিজেপির দখলে ছিল চারটি।
গত লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই আলুবলয়ে তৃণমূল সরকারের উপর ক্ষোভ বাড়ছিল। একাধিক কৃষক সংগঠন বার বার দাবি করেও সুরাহা পায়নি। চাষি থেকে পাইকারি কিংবা খুচরো ব্যবসায়ী, সকলের মধ্যেই মমতার সরকারের আলুনীতি নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ ক্রোধে পর্যবসিত হচ্ছিল। এমনকি, পূর্ব বর্ধমানের একাধিক তৃণমূল নেতাও আলুচাষিদের ক্ষোভের কথা দলের গোচরে আনার চেষ্টা করেছিলেন। গত বছর ডিসেম্বর মাসেই তৃণমূল ভবনে গ্রামীণ বর্ধমানের নেতারা আলু-বলয়ে মানুষের ক্ষোভ নিয়ে এক প্রথম সারির নেতাকে জানাতে এসেছিলেন। কিন্তু ওই প্রবীণ নেতা তাঁর অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন জেলার নেতাদের।
হুগলিতে আরামবাগ মহকুমার সর্বত্রই আলু চাষ হয়। সেখানকার চারটি আসনই ২০২১ সালে বিজেপি জিতেছিল। তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, পাঁচ বছর আগেই আলু-বলয়ে বিপর্যয়ের বীজ পোঁতা হয়ে গিয়েছিল। এ বার দুই জেলাতেই ছাপ ফেলেছে। হুগলির সিঙ্গুর, হরিপাল, তারকেশ্বর, পান্ডুয়ার মতো আলুর উর্বর জমিতে পদ্মফুল ফুটেছে। খণ্ডঘোষ বাদ দিয়ে পূর্ব বর্ধমানের যে সব এলাকা আলুচাষের জন্য খ্যাত, সেখানে তৃণমূল কার্যত জমিই পায়নি। নতুন সরকার গঠনের পরে চার দিনের মাথায় সেই আলু-বলয়েই গুরুত্ব দিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।