• ভোজ্য তেলের সঙ্কট, কেন অন্য দেশের উপর এতটা নির্ভরশীল আমাদের রান্নাঘর?
    এই সময় | ১৩ মে ২০২৬
  • রান্নার তেল এমন একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যার দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে প্রায় সব পরিবারের বাজেটে। শুধু ঘরোয়া রান্না নয়, রেস্তরাঁ, প্যাকেটজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং রাস্তার খাবারের দামও বেড়ে যেতে পারে।

    সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে রান্নার তেলের ব্যবহার ১০ শতাংশ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এই বার্তা শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের বাড়তে থাকা ভোজ্য তেল আমদানি বিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার উদ্বেগ।

    ইরান-ইজ়রায়েল সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং টাকার দুর্বলতা— সব মিলিয়ে ভোজ্য তেল এখন ভারতের অর্থনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে।

    কেন হঠাৎ ভোজ্য তেল জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠল?
    ভারত মোট ভোজ্য তেলের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায়। শিল্পমহলের অনুমান অনুযায়ী, বছরে ১.৬ থেকে ১.৬৭ কোটি টন ভোজ্য তেল বিদেশ থেকে আসে।

    প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB)-র প্রকাশিত নীতি আয়োগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দেশে মোট ভোজ্য তেল উৎপাদন হয়েছে ১,২১.৮ লক্ষ টন। অর্থাৎ দেশের মোট চাহিদার মাত্র ৪৪ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হয়েছে।

    ভারতে ব্যবহৃত পাম তেলের বড় অংশ আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। সূর্যমুখী তেলের বড় উৎস ইউক্রেন ও রাশিয়া। সয়াবিন তেলের সরবরাহ নির্ভর করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার উপর।

    ফলে বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ, খরা, বন্যা, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দিলেই তার প্রভাব দ্রুত ভারতীয় বাজারে পড়ে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই নির্ভরতার বড় উদাহরণ। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত ৮.৪৩ লক্ষ টন সূর্যমুখী তেল আমদানি করেছিল। এর ৮৫ শতাংশ এসেছিল ইউক্রেন থেকে।

    গেটওয়ে হাউসের সিনিয়র ফেলো অমিত ভাণ্ডারি জানিয়েছে, ভারত খাদ্যশস্যে অনেকটাই স্বনির্ভর হলেও রান্নার তেলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

    কী ভাবে ভোজ্য তেলের আমদানির উপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে উঠল ভারত?
    একসময় ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে ভারত অনেকটাই স্বনির্ভর ছিল। সর্ষে, চিনাবাদাম, তিল এবং নারকেল থেকে উৎপাদিত তেল দেশের চাহিদার বড় অংশ মেটাত।

    ১৯৮৬ সালে প্রযুক্তি মিশন অন অয়েলসিডস চালুর পর দেশে ‘ইয়েলো রেভলিউশন’-এর সূচনা হয়। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারত নিজের চাহিদার ৯৪ থেকে ৯৮ শতাংশ ভোজ্য তেল দেশে উৎপাদন করত। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার এবং আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা দ্রুত বেড়েছে।

    ২০০০ সালের গোড়ায় মাথাপিছু ভোজ্য তেল খরচ ছিল ৫ থেকে ৮ কেজি। বর্তমানে তা ১৯ কেজিরও বেশি। কিছু রিপোর্টে ২০২৫ সালে তা ২৩ কেজির কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ তেলবীজের চাষ বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। ফলে অনিয়মিত বর্ষা উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও অনেক কৃষক ধান ও গমের মতো ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। কারণ এই ফসলগুলিতে সরকারি সহায়তা তুলনামূলক বেশি।

    কেন এত দ্রুত ওঠানামা করে রান্নার তেলের দাম?

    উচ্চ আমদানিনির্ভরতা: টাকা দুর্বল হলে আমদানি খরচ বেড়ে যায়।

    ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত: যুদ্ধ বা পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা সরবরাহে সমস্যা তৈরি করে।

    জলবায়ু পরিবর্তন: খরা বা অতিবৃষ্টিতে উৎপাদন কমে যেতে পারে।

    বায়োফুয়েলের চাহিদা: পাম ও সয়াবিন তেলের একটি অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

    কী প্রভাব পড়ে ভারতীয় পরিবারের উপর?
    ভোজ্য তেল প্রতিদিনের রান্নার অপরিহার্য উপাদান। দাম বাড়লে পরিবারগুলি ভাজাভুজি কমায়, সস্তা তেল ব্যবহার করে বা অন্য খরচ কমায়।

    রেস্তরাঁ এবং রাস্তার খাবারের ব্যবসায়ীদের খরচও বেড়ে যায়। ফলে শিঙাড়া, পাকোড়া, বিরিয়ানি বা রেস্তরাঁর খাবারের দাম বাড়তে পারে। বিস্কুট, নোনতা খাবার, ইনস্ট্যান্ট ফুড এবং বেকারি পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ে।

    কেন্দ্র ন্যাশনাল মিশন অন এডিবল অয়েলস–অয়েলসিডস (NMEO-Oilseeds) প্রকল্প চালু করেছে। এর লক্ষ্য ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে তেলবীজ উৎপাদন ৩.৯ কোটি টন থেকে ৬.৯৭ কোটি টনে উন্নীত করা।

    সালভেন্ট এক্সট্র্যাক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার মতে, রান্নার তেলের ব্যবহার কিছুটা কমানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর চাপও কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্যকরণ এবং সচেতন খাদ্যাভ্যাস— এই চারটি পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।

    ভারত যখন মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে, তখন ভোজ্য তেল নিঃশব্দে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
  • Link to this news (এই সময়)