এই সময়: বেশি রাতে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো ডাক্তারি পড়ুয়ার একটা পিডিএফ— তার সূত্র ধরেই সামনে এল মেডিক্যাল প্রবেশিকা নিট–ইউজির প্রশ্ন ফাঁসের বিশাল চক্রের হদিশ! রাজস্থান পুলিশ এবং সিবিআইয়ের তদন্তের সূত্রে যে তথ্য উঠে আসছে, তা হার মানাবে বলিউডি চিত্রনাট্যকেও। ৩ মে দেশজুড়ে হওয়া নিট–ইউজির প্রশ্নফাঁসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ সামনে আসার পরেই মঙ্গলবার পরীক্ষাটি বাতিল বলে ঘোষণা করেছে জাতীয় পরীক্ষণ সংস্থা (এনটিএ)।
মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার কয়েকদিন আগেই মোটা টাকার বিনিময়ে পড়ুয়া ও কোচিং সেন্টারগুলোর কাছে বিক্রি করা হয়েছিল এক সেট ‘গেস পেপার’। আগের বছরের প্রশ্ন, মক টেস্ট এবং শিক্ষকদের সাজেশনের ভিত্তিতেই সাধারণত এ ধরনের ‘গেস পেপার’ বা ‘মডেল কোয়েশ্চন পেপার’ তৈরি করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মোটা টাকায় বিক্রি হওয়া, হাতে লেখা এই ‘গেস পেপার’–এর সূত্রেই সামনে এল প্রশ্নফাঁসের ঘটনা।
তদন্তকারীদের দাবি, ২ মে, নিট–ইউজি পরীক্ষার আগের দিন কেরালার এক ডাক্তারি পড়ুয়া তাঁর ফোনে পিডিএফ ফর্ম্যাটে ‘গেস পেপার’ পান। তিনি নিট পরীক্ষার্থী নন, ফলে ওটা তাঁর লাগবে না বুঝেই তিনি ওই পিডিএফ রাজস্থানের সিকারে থাকা বাবাকে ফরোয়ার্ড করে দেন। সিকারে কোচিং সেন্টারে পড়া পড়ুয়াদের নিয়ে একটি হস্টেল চালান ওই মেডিক্যাল পড়ুয়ার বাবা। তিনি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন, সেটা বুঝেই ছেলে পিডিএফটা পাঠিয়ে বাবাকে মেসেজ করে দিয়েছিলেন— ওই ‘গেস পেপার’ তাঁর হস্টেলে থাকা পরীক্ষার্থীদের কাজে লাগতে পারে।
৩ মে সকালে ভদ্রলোক যতক্ষণে ওই পিডিএফ দেখেন, ততক্ষণে তাঁর হস্টেলে থাকা চার ছাত্রী পরীক্ষাকেন্দ্রের দিকে রওনা দিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের পাঠিয়ে লাভ নেই বুঝেই ভদ্রলোক ‘গেস পেপার’টি তাঁর পরিচিত, স্থানীয় এক কেমিস্ট্রি টিচারকে পাঠিয়ে রাখেন। এ দিকে, ৩ মে–র পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরে নিটের প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ওই ‘গেস পেপার’ মিলিয়ে কেমিস্ট্রি শিক্ষকের চক্ষু চড়কগাছ। দেখা যায়, কেমিস্ট্রির ১০৮টি প্রশ্নের মধ্যে ৪৫টি–ই ওই ‘গেস পেপার’–এর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওই ‘গেস পেপার’ তাঁর সহকর্মী, এক বায়োলজির শিক্ষককে দেখান। তিনি মিলিয়ে দেখেন, নিটের বায়োলজি প্রশ্নের ২০৪টির মধ্যে ৯০টি–ই ‘গেস পেপার’–এর সঙ্গে কমন! ১৩৫টি প্রশ্ন এ ভাবে মিলে যাওয়ায় শিক্ষকদের সন্দেহ হয়, নিশ্চয়ই আসল প্রশ্নপত্র কোনও ভাবে ফাঁস হয়েছে, তা দেখেই তৈরি হয়েছে ‘গেস পেপার’। এই ১৩৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেই ৭২০–এর মধ্যে অন্তত ৬০০ নম্বর নিশ্চিত! ব্যাপারটাতে সন্দেহজনক কিছু আছে, বুঝেই স্থানীয় থানায় অভিযোগ করতে যান ওই কেমিস্ট্রি শিক্ষক এবং হস্টেল মালিক। কিন্তু তাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থে পরীক্ষা বাতিল করাতে চাইছেন ভেবে অভিযোগ নিতে চায়নি পুলিশ।
এর পর এনটিএ–কে সরাসরি ই–মেল করেন ওই শিক্ষক। তার সূত্র ধরেই পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার চার দিন পরে নড়েচড়ে বসে এনটিএ। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ‘গেস পেপার’–এর মিল দেখে গোয়েন্দা সংস্থা আইবি এবং রাজস্থানের ‘স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপ’কে ৮ মে তদন্তের অনুরোধ জানায় তারা।
প্রথমে ওই হস্টেল মালিককেই সন্দেহ করেছিল পুলিশ। তাঁর ফোন সিজ়–ও করা হয়। কিন্তু পরে বোঝা যায়, না–বুঝেই প্রশ্নফাঁসের বড়সড় চক্র ফাঁস করেছেন ওই হস্টেল মালিক। নিরাপত্তার স্বার্থেই ওই ব্যক্তি, তাঁর ডাক্তারি পড়ুয়া ছেলে এবং ওই শিক্ষকের পরিচয় গোপন রেখেছে পুলিশ। রাজস্থান পুলিশের তদন্তের সূত্রে জানা যায়, জয়পুরের কাছে জামওয়ারামগড়ের দুই ভাই সিকারের একজনের কাছে এই ‘গেস পেপার’ বিক্রি করেছিল।
তারা পেপারটা পেয়েছিল হরিয়ানার একজনের থেকে। সেই হরিয়ানার ছেলেটির সূত্র ধরেই মহারাষ্ট্রের নাসিকের যোগসূত্র উঠে আসে। তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে যাওয়ার পরে মঙ্গলবার মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে শুভম খৈরনার নামে একজনকে আটক করা হয়। শুভম ‘আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি’র স্টুডেন্ট। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ৩০ বছরের শুভম ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে এই ‘গেস পেপার’ পুনের একজনের কাছ থেকে কিনেছিলেন, পরে সেই পেপার ১৫ লক্ষ টাকায় হরিয়ানার একজনকে বিক্রি করেন তিনি।
এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশনে পাঠানো হয়েছিল ওই প্রশ্নপত্র। এর পর ধীরে ধীরে গুরগ্রাম, জয়পুর, সিকার ও অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে এই ‘গেস পেপার’। মঙ্গলবার বিকেলে মন্দিরে যাওয়ার সময়ে শুভমকে আটক করে সিবিআই। সূত্রের খবর, ধরা পড়ার ভয়ে চুল কেটে লুক বদলে ফেলেছিলেন শুভম, কিন্তু তদন্তকারীরা পুরোনো ছবি ও টেকনিক্যাল সার্ভেলেন্স ডেটা দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন।
তদন্তকারীদের ধারণা, নিটের প্রশ্নপত্র যে ছাপাখানায় প্রিন্ট করা হয়েছিল, সেখানকার কোনও কর্মী এই চক্রান্তে যুক্ত। তার মদতেই আসল প্রশ্নপত্র পোর্টেবল স্ক্যানারে কপি করে নেওয়া হয়। সন্দেহ এড়াতে আসল প্রশ্নগুলোর সঙ্গে অন্য প্রশ্ন জুড়ে হাতে লেখা ‘গেস পেপার’ তৈরি করে প্রশ্নফাঁসের চক্রীরা, তার পর এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে মোটা টাকায় বিক্রি করা হয় সেগুলো। আপাতত সেই চক্রের বাকি মাথাদের খোঁজ পেতে ব্যস্ত তদন্তকারীরা।