• সময় নিয়ে মন্ত্রিসভায় ভারসাম্য চায় বিজেপি, কাকে কাকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছে পার্টি?
    এই সময় | ১৪ মে ২০২৬
  • এই সময়: ১৯৭৭। ২০১১। ২০২৬।প্রথমবার ৩৪ বছর এবং দ্বিতীয় বার ১৫ বছর বাদে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে বাংলায়। তবে ১৯৭৭ বা ২০১১–এর তুলনায় এ বার কি খানিক বদল রাজ্যের নতুন ক্ষমতাসীন দলের মানসিকতাতেও!

    গত ৪ মে ভোটের রেজ়াল্টে বিজেপির জয়জয়কারের পরে প্রথম প্রশ্ন ছিল, নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন। পরপর দু’বার তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সুপ্রিমো তথা সিটিং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে প্রত্যাশামতোই মুখ্যমন্ত্রীর পথে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।

    শনিবার তাঁর দপ্তরের আরও পাঁচজন মন্ত্রীর নাম ঘোষণা হয় ব্রিগেড ময়দানের মঞ্চ থেকে। তারপর থেকেই সাধারণ মানুষ তথা রাজ্য প্রশাসনের কৌতূহল, বাকি মন্ত্রীদের নাম কবে ঘোষিত হবে। নতুন পাঁচ মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া ও ক্ষুদিরাম টুডু— এই পাঁচ মন্ত্রী নিজ নিজ দপ্তরের কাজ বুঝে নিয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠকও করেছেন। তবে শুভেন্দুর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় বাকি মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চাইছেন না বিজেপি নেতৃত্ব।

    সূত্রের দাবি, বিজেপির অবস্থান স্পষ্ট— পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠনে দু’দিন দেরি হলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু তাড়াহুড়োয় কোনও যোগ্য দাবিদারের সঙ্গে যেন অবিচার না হয়। এক শীর্ষ বিজেপি নেতার কথায়, ‘এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভা নয় যে, চোখের সাম‍নে যাঁরা বসে আছেন, তাঁদের মন্ত্রী করে দেওয়া হবে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা তৈরি হচ্ছে, সেখানে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। যাতে শুধু বিরোধীরা নন, সাধারণ মানুষও কারও দিকে আঙুল তুলতে না–পারেন।’

    বিজেপির জয়ী বিধায়কদের মধ্যে বুধবার শঙ্কর ঘোষ ও স্বপন দাশগুপ্তকে শিক্ষা এবং শারদ্বত মুখোপাধ্যায় ও ইন্দ্রনীল খাঁকে স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে আগামীর জন্য কিছু গাইডলাইন তৈরির কথা বলা হয়েছে নতুন সরকারের তরফে। যদিও আগামী দিনে তাঁদের এই সব দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, সেটা স্পষ্ট নয়। স্বপন বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা।

    শঙ্কর আগের টার্মে বিরোধী হুইপ ছিলেন। শারদ্বত ও ইন্দ্রনীল দু’জনেই বিশিষ্ট চিকিৎসক। সে দিক থেকে তাঁদের এই বিষয়ে গাইডলাইন তৈরিতে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে বলেই খবর বিজেপি সূত্রে। তবে মন্ত্রিসভার সদস্য চূড়ান্ত করতে আরও আলোচনা করে নিতে চাইছেন গেরুয়া নেতৃত্ব। রাজ্য বিজে‍পি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘দল আর সরকারের সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই বাদবাকি ম‍ন্ত্রীদের নাম চূড়ান্ত হবে।’ বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, খুব বড় বা খুব ছোট মন্ত্রিসভা তৈরির পক্ষপাতী নন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তাঁরা চাইছেন, শুভেন্দুর টিমে আরও জনা তিরিশেক মন্ত্রী থাকুন।

    ২০১১–তে বামফ্রন্টকে উৎখাত করে মসনদ দখল করেছিল তৃণমূল। সে বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই শপথ বাক্য পাঠ করেছিলেন তাঁর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য। একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ১৯৭৭-এ জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার সময়ও। রীতি ভাঙল বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পর চার দিন কেটে গিয়েছে। অথচ তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা এখনও ছয়। ২০২৪–এ ওডিশায় প্রথমবারের জন্য তৈরি হয়েছে বিজেপি সরকার। কিন্তু সেখানেও বাংলার মতো ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করতে দেখা যায়নি পদ্ম নেতৃত্বকে। ২০২৪–এর ১২ জুন ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোহনচরণ মাঝি। সে দিন শপথবাক্য পাঠ করে গোটা মন্ত্রিসভাই।

    তা হলে বাংলার ক্ষেত্রে বিজেপি অন্য পথে হাঁটল কেন? গেরুয়া শিবিরের একাংশের ব্যাখ্যা, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাংলা নিয়ে বিজেপির আবেগ অন্য সব রাজ্য থেকে আলাদা। বহু সাধ্য–সাধনার পরে বাংলার তখত বিজেপির দখলে এসেছে। সেই রাজ্যে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া তাই ফুলপ্রুফ করাই নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের লক্ষ্য। সূত্রের খবর, তাঁরাও চাইছেন, আরএসএস, বিজেপির পরিষদীয় দল এবং সাংগঠনিক দলের মধ্যে সমন্বয় রেখেই ঝকঝকে মন্ত্রিসভা তৈরি করতে। মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ার দাবিদার অ‍নেক। বিজেপি নেতৃত্ব চাইছেন, মন্ত্রী নির্বাচনে কোনও ফাঁকি যাতে না থাকে।

    শপথ নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলে দিয়েছেন, ‘আমি নই, আমরা’। নতুন মন্ত্রিসভায় মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রীদেরও যথেষ্ট কাজ করার সুযোগ থাকছে। সেক্ষেত্রে কোনও যোগ্য মন্ত্রী যাতে বাদ না–পড়েন এবং সরকারের বদনাম না–হয়, সেটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে পদ্ম–নেতৃত্বকে। উত্তরবঙ্গের এক বিজেপি বিধায়কের কথায়, ‘বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারী। ফলে তাঁর মতামত সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পার্টি কাকে কাকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছে, সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই পরিস্থিতিতে সমন্বয়ের মাধ্যমেই যোগ্যদের বেছে নেওয়া সম্ভব। সেই প্রক্রিয়া চলছে।’

  • Link to this news (এই সময়)