দড়ি ধরে মারো টান.কৃষ্ণের সাম্রাজ্যে আছড়ে পড়ল জনরোষ
বর্তমান | ১৪ মে ২০২৬
ব্রতীন দাস, জলপাইগুড়ি: ‘আমার কথা না শুনলে এলাকাছাড়া করব। লেজ গুটিয়ে পালাতে হবে।’ ভোটের আগে বাসিন্দাদের এভাবেই শাসানোর অভিযোগ ওঠে জলপাইগুড়ির তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে। তাঁর সেই হুমকির অডিও রেকর্ডিং ‘বর্তমান’-এর হাতে এসেছে। তাতে শোনা যাচ্ছে, তৃণমূলের এসসি ওবিসি সেলের জেলা সভাপতি কৃষ্ণ দাস কোনো একজনকে শাসাচ্ছেন। সেই ব্যক্তির উদ্দেশে চরম অশালীন ভাষাও প্রয়োগ করছেন তিনি। যদিও ওই অডিওর সত্যতা যাচাই করেনি ‘বর্তমান’। কৃষ্ণর মোবাইল বন্ধ থাকায় তাঁর প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে তৃণমূলের জেলা সভানেত্রী মহুয়া গোপের দাবি, কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠছে, দল তাকে সমর্থন করে না।
চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ডিংয়ে ‘বাহুবলী’ কৃষ্ণকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘আয়, এদিকে আয়। বিজেপি করিস তো? আমার কাছে সব রেকর্ডিং আছে। শোনাব? বিজেপিতে একটা ভোট পড়লে লেজ গুটিয়ে উঠিয়ে দেব।’ কৃষ্ণর ধমকির মুখে আমতা আমতা করে সেই ব্যক্তি বলছেন, আমি আপনার সঙ্গেই আছি দাদা। যদিও তাতে এতটুকু নরম না হয়ে কৃষ্ণর পালটা শাসানি, ‘চোপ, সবক’টাকে চিহ্নিত করে রেখেছি। একটা ভোটও যদি বিজেপিতে পড়ে, কে তোদের বাঁচায় দেখব।’
জলপাইগুড়ির রংধামালি, বারোপেটিয়া এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, কৃষ্ণ দাসের এই শাসানি নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে দাঁতে দাঁত চেপে কৃষ্ণ দাস ও কৃষ্ণ-বাহিনীর সন্ত্রাস সহ্য করেছেন তাঁরা। কাউকে মাথা ন্যাড়া করে ঘোরানো হয়েছে এলাকায়। কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি দিনের পর দিন। কৃষ্ণর বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেউ পুলিশে অভিযোগ জানানোর চেষ্টা করলে থানা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি তিনি। মাঝপথ থেকে তাঁকে ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়েছে কৃষ্ণর বাহিনী। কিন্তু এবারের ভোটে গোহারা হার এবং বিজেপি কর্মীদের উপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় কৃষ্ণর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের হতেই ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন এলাকার বাসিন্দা থেকে ব্যবসায়ীরা। বিজেপি জেতায় যতটা না খুশি তাঁরা, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত কৃষ্ণের একচেটিয়া আধিপত্যের পতন হওয়ায়। এদিকে বিজেপি কর্মীদের উপর হামলার ঘটনায় কৃষ্ণের আরও এক অনুগামীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এর ফলে মোট গ্রেপ্তারির সংখ্যা দাঁড়াল আট জন।
বুধবার দুপুরে রংধামালি বাজারে অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষক বলেন, হীরক রাজার দেশে সিনেমার সেই জনপ্রিয় সংলাপ মনে আছে তো? দড়ি ধরে মারো টান...। এক্ষেত্রেও তাই। কৃষ্ণর সাম্রাজ্যের পতন হতেই আছড়ে পড়ছে জনরোষ। তিস্তার পাড়ে লুকিয়ে রাখা একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দারা বলছেন, ওই গাড়িতে চেপেই কৃষ্ণের ‘লেঠেল বাহিনী’ এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। কৃষ্ণ এলাকাছাড়া হতেই বন্ধ হয়েছে কারবার। রাতারাতি উধাও হয়ে গিয়েছে ডাম্পার। রংধামালি এলাকায় মহকুমা শাসক অভিযান চালিয়ে তিস্তার খাদ থেকে বাজেয়াপ্ত করেছেন বালি তোলার যন্ত্র।
অভিযোগ, অনুগামীদের প্রধানের চেয়ারে বসিয়ে বকলমে কৃষ্ণ দাসই পাহাড়পুর, পাতকাটা ও বারোপেটিয়া পঞ্চায়েত চালাতেন। কৃষ্ণ ‘উধাও’ হয়ে যেতেই তাঁর অনুগামী প্রধানরাও পঞ্চায়েতে পা রাখছেন না। ফলে লাটে উঠেছে কাজকর্ম। বারোপেটিয়া পঞ্চায়েতের অ্যাম্বুলেস এতদিন ধরে কৃষ্ণ অনুগামী এক তৃণমূল নেতার কব্জায় ছিল। এদিন বিজেপি কর্মীরা ওই অ্যাম্বুলেন্স উদ্ধার করে পঞ্চায়েতে নিয়ে আসেন। এদিকে, কৃষ্ণর প্রাসাদোপম যে বাড়ি একসময় ঘিরে থাকত তাঁর বাহিনী, সেই বাড়ি এখন শুনশান।
বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী বলেন, প্রশাসনকে ঢাল করে কৃষ্ণ দাস সাধারণ মানুষকে অনেক শাসিয়েছেন। দম থাকলে এখন কাউকে শাসিয়ে দেখুন। পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে কেন? সাহস থাকলে তিনি এলাকায় ফিরুন। • নিজস্ব চিত্র।