• ঝড়ের বেগে উড়ে যাচ্ছে মানুষ, উত্তর প্রদেশে দাপট দেখাচ্ছে ‘থান্ডারস্কোয়াল’
    এই সময় | ১৫ মে ২০২৬
  • হলিউড সিনেমার পর্দায় এমন ছবি দেখা যায়। কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে আকাশে উঠে হারিয়ে যাচ্ছে গোটা গ্রাম। কোথাও আবার গোটা একজন মানুষ হাওয়ার তোড়ে ছিটকে বেরিয়ে গেলেন। এই ছবি এ বার ঘোর বাস্তব। তাও আবার ভারতের মাটিতেই। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের বরেলিতে দেখা গিয়েছে ঝড়ের ধাক্কা কার্যত খড়কুটোর মতো উড়ে গেলেন এক ব্যক্তি। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিয়ো প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি কেউ। কিন্তু পরে দেখা যায় খবরটি ঠিক। ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে উত্তরপ্রদেশে ঝড়ের ভয়ঙ্কর তাণ্ডবের কথা। কেন এমন হয়েছিল? আবহাওয়াবিদেরা জানাচ্ছেন এই ঘটনা বাস্তব এবং বিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম ‘থান্ডারস্কোয়াল’। কালবৈশাখী হোক বা সাইক্লোনের দাপট, ঝড়ের ধাক্কা মৃত্যুর ঘটনা ভারতে নতুন নয়। কিন্তু অন্য ঝড়ের ভয়াবহতাকে হয়তো ছাপিয়ে গিয়েছে উত্তরপ্রদেশের এই ‘থান্ডারস্কোয়াল’।

    মৌসম ভবন জানাচ্ছে, ‘থান্ডারস্কোয়াল’ গ্রীষ্মের বিকেলে ঘনিয়ে ওঠা কোনও সাধারণ ঝড়বৃষ্টির পরিবেশ নয়। এটি ‘পরিচালন ঝড়’, যা অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং তীব্র গতির হতে পারে। এই ধরনের ঝড় সৃষ্টি হয় মাটির সঙ্গে লেগে থাকা বাতাসের স্তর গরম হয়ে খুব দ্রুত উপরে উঠে যাওয়ার সময়ে (কনভেকশন) চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা কনকনে ঠান্ডা ও জলীয় বাষ্পে ভরা বাতাসের সঙ্গে মিশে গেলে। মিশ্রণে তৈরি হয় বিশালাকার ঝড়ের মেঘ বা ‘কিউমুলোনিম্বাস’। এই মেঘ থেকেই বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার সৃষ্টি হয়। যখন এই মেঘ ভেঙে পড়ে, তখন তার ভিতরের ঠান্ডা বাতাস প্রবল বেগে মাটির দিকে নেমে আসে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই শক্তিশালী হাওয়া মাটির উপরের আলগা ধুলো উড়িয়ে নিয়ে এক ভয়ঙ্কর ধুলোর ঝড় তৈরি করে। এই ঝড় ‘আঁধি’ নামে পরিচিত। আবহবিদরা এই ‘থান্ডারস্কোয়াল’–কে আকাশের বিশাল এক ‘হিট ইঞ্জিন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

    ১৩ মে-র বুলেটিনে মৌসম ভবন জানিয়েছিল, উত্তর পাকিস্তান ও জম্মু অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে একটি ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ হরিয়ানা ও উত্তর-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের উপরেও আরও একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছিল। এই দুই ওয়েদার সিস্টেমই এই ‘থান্ডারস্কোয়াল’ তৈরির আসল কারিগর।

    পুনের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজি’ (আইআইটিএম)–এর মতে, ওই অঞ্চলে সক্রিয় থাকা একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝাই এই ভয়াবহ ‘থান্ডারস্কোয়াল’–এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ভূমধ্যসাগরে তৈরি হয়ে ক্রমশ পূর্ব দিকে এগোতে শুরু করে। এটি ক্রমশ ইরানের মালভূমি, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান পেরিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছয়। ভূমধ্যসাগর ছাড়াও এই ধরনের বায়ুপ্রবাহ ক্যাস্পিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণসাগর থেকে জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করতে থাকে। পশ্চিম থেকে বয়ে আসা জলীয় বাষ্পে পরিপূর্ণ এই বাতাসের স্রোত পাঞ্জাব–হরিয়ানায় আগে থেকেই তৈরি পরিচালন ঝড়ের আবহের সঙ্গে মিশে গিয়ে ওই ওয়েদার সিস্টেমকে বিধ্বংসী করে তুলেছিল।

    আবহবিদরা জানাচ্ছেন, মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রাক-বর্ষার এই তিন মাসে উত্তর-পশ্চিম ভারত, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে তীব্র গরম পড়ে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রবল পরিচালনগত (কনভেকটিভ) কার্যকলাপ শুরু হয়। এই সময়ে বাতাস শুক‍নো থাকে, মাটি জলের অভাবে আলগা থাকে আর উত্তপ্ত ভূমি ও উপরের বায়ুস্তরের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য থাকে সর্বাধিক। তাই এই অবস্থায় একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বা স্থানীয় কোনও ঘূর্ণাবর্ত পুরো ব্যবস্থাকে হঠাৎ তীব্র ঝড়ে পরিণত করতে পারে। উত্তরপ্রদেশে ঠিক এমনটাই হয়েছিল। ৯ মে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)