আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভোটের আগে একাধিকবার বাংলায় “বুলডোজার অ্যাকশন”-এর বার্তা দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শপথ নেওয়ার পর পরই সেই বার্তারই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে। বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রশাসনিক অভিযান শুরু হয়েছে শহর জুড়ে। বুধবার তিলজলার অগ্নিদগ্ধ বহুতলের অংশ ভাঙার পর, বৃহস্পতিবার প্রশাসনের নজরে আসে গড়িয়ার মিতালি সংঘের মাঠের পাশের বহুল চর্চিত ক্লক টাওয়ার। সকাল থেকেই সেখানে মোতায়েন করা হয় পুরসভার কর্মী, বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের। নিরাপত্তার ঘেরাটোপে শুরু হয় ভাঙার কাজ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালে গড়িয়ার মিতালি সংঘের মাঠের পাশে ওই ক্লক টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই সময় রাজ্যের তৎকালীন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এই নির্মাণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে দাবি এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়ম না মেনেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ক্লক টাওয়ারটি গড়ে তোলা হয়েছিল।
মাঠের একটি অংশ দখল করে ক্লক টাওয়ারটি নির্মাণ হওয়ায় শুরু থেকেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল এলাকার মানুষের মধ্যে। অভিযোগ ওঠে, স্থানীয়দের আপত্তি এবং একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও প্রশাসনের তরফে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।
এই নির্মাণকে কেন্দ্র করে সেই সময় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় কলকাতা হাইকোর্টে। আদালতের তরফে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং অবৈধ অংশ ভাঙার নির্দেশিকা জারি করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। বরং তৎকালীন শাসক দলের স্থানীয় নেতৃত্বের নির্দেশে কয়েকজন মহিলা আন্দোলনে শামিল হয়ে ওই নির্মাণ ভাঙার কাজ আটকে দেন। এরপর দীর্ঘদিন ধরেই ক্লক টাওয়ারটি ঘিরে বিতর্ক চলছিল।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। নতুন সরকারের তরফে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকায় একাধিক অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বুলডোজার অভিযান শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার গড়িয়ার মিতালি সংঘের পাশের ক্লক টাওয়ার ভাঙার কাজ শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় বাহিনী। যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে কড়া নজর রাখা হয়। পুরসভার আধিকারিকদের উপস্থিতিতে প্রথমে ক্লক টাওয়ারের চারপাশ খালি করা হয়। পরে বুলডোজার এনে ভাঙার কাজ শুরু হয়। ঘটনাস্থলে বহু স্থানীয় মানুষ জড়ো হন। অনেকে মোবাইলে সেই দৃশ্য রেকর্ড করতেও দেখা যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিন বিকেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। তবে কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছুটা দূরে আটকে দেয়। পরে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, “আমি বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে। কিন্তু সকালে ঘোষণা করে রাতে বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রশাসন এবং স্থানীয় কাউন্সিলরেরও দায় রয়েছে। শুধুমাত্র গরিব মানুষের উপর বুলডোজার চালালে হবে না, সব ক্ষেত্রেই সমান আইন প্রযোজ্য হওয়া উচিত।”
নওশাদের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর চর্চা। একদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, নতুন সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বুলডোজার ব্যবহার করছে। অন্যদিকে শাসকপক্ষের দাবি, আদালতের নির্দেশ মেনেই অবৈধ নির্মাণ ভাঙা হচ্ছে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
তবে গড়িয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ ক্লক টাওয়ার ভাঙার সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বহুদিন ধরেই মাঠের জায়গা দখল করে বেআইনি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষ মাঠের জায়গা ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়তেন। অনেকেই অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের মতামত না নিয়েই ওই নির্মাণ করা হয়েছিল। তাই প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন তাঁরা।
এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, “এটা শুধু একটা ক্লক টাওয়ার নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আদালতের নির্দেশ থাকার পরও এতদিন কিছু হয়নি। এখন অন্তত আইন নিজের কাজ করছে।” অন্য একজন বলেন, “মাঠ বাঁচানোর দাবিতে আমরা বহুদিন আন্দোলন করেছি। আজ অবশেষে সেই বেআইনি নির্মাণ ভাঙা হচ্ছে দেখে ভাল লাগছে।”
কলকাতায় লাগাতার বুলডোজার অভিযান ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। আগামী দিনে আরও একাধিক বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রশাসন পদক্ষেপ করতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর সেই আবহেই গড়িয়ার মিতালি সংঘের পাশের ক্লক টাওয়ার ভাঙার ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।