• শরীরে বাসা বেঁধেছিল জটিল ক্যানসার, জীবনযুদ্ধ সামলে উচ্চমাধ্যমিকে দশম অদ্রিজা
    প্রতিদিন | ১৫ মে ২০২৬
  • সমবয়সিরা তখন স্কুলব্যাগ কাঁধে ক্লাসে যাচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে টিফিন ভাগ করে খাচ্ছে, পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, সেসময় জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল অদ্রিজা গণ। তখন সে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। ক্যানসার আক্রান্ত শরীর একের পর এক কেমোথেরাপিতে ভেঙে পড়েছিল, ঝরে যাচ্ছিল মাথার চুল, থেমে গিয়েছিল স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু থামেনি তার স্বপ্ন। ক্যানসারের বিরুদ্ধে সেই অসম যুদ্ধ জিতেই এবার উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের মেধাতালিকায় দশম স্থান দখল করল নিমতার অদ্রিজা গণ। প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৭।

    উত্তর দমদম পুরসভার ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের নিমতা উদয়পুর সাউথ এলাকার বাসিন্দা অদ্রিজা বাগবাজার রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী অদ্রিজার বেড়ে ওঠা শিক্ষক পরিবারে। বাবা জয়মঙ্গল গণ টাকি বয়েজ হাইস্কুলের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক, মা জ্যোতি গণ বেলঘরিয়া বয়েজ হাইস্কুলের ইংরেজির শিক্ষিকা। বড় দিদি সৃজা পিএইচডির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর আচমকাই বদলে যায় তাদের জীবন। মাত্র ১২ বছর বয়সে অদ্রিজার শরীরে ধরা পড়ে টি-সেল লিম্ফোমা নামের জটিল ক্যানসার।

    ছোটবেলাতেই ক্লাসঘর, বেঞ্চ-বোর্ড ছেড়ে তাকে ছুটতে হয়েছিল মুম্বইয়ের হাসপাতালে। টানা আট মাস ধরে চলে চিকিৎসা, অসংখ্য পরীক্ষা আর ৮২টি কেমোথেরাপির যন্ত্রণা। চিকিৎসার কারণে এক বছর পিছিয়েও যায় পড়াশোনা। সপ্তম শ্রেণিতে থেকে যেতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু হার মানেনি অদ্রিজা। হাসপাতালের বেডেও পাশে থাকত বই। কেমোথেরাপির পর ক্লান্ত শরীর নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যেত সে। ২০২১ সালের ১৮ জুন শেষ হয় তার ৮২তম কেমো। তারপরও নিয়মিত চেকআপ আর কড়া বিধিনিষেধের মধ্যেই শুরু হয় নতুন লড়াই। রাত জেগে পড়ার ক্ষমতা ছিল না। বাইরে টিউশনেও যেতে পারত না। তাই নিজের মতো করেই সময়কে গুছিয়ে নিয়েছিল অদ্রিজা। দুপুরের বিশ্রাম বাদ দিয়ে ধীরে ধীরে বইয়ে ডুবে থাকত। পড়াশোনাই হয়ে উঠেছিল তার বেঁচে ফেরার শক্তি।

    সেই জেদের ফল মিলল বৃহস্পতিবার। কলা বিভাগে পড়েও রাজ্যের মেধাতালিকায় দশম স্থান দখল করে অদ্রিজা যেন প্রমাণ করে দিল, ইচ্ছাশক্তির কাছে কঠিনতম অসুখও হার মানে। অদ্রিজার মার্কশিটও চোখধাঁধানো! ইংরেজিতে ৯৭, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে ৯৭, অর্থনীতিতে ৯৮, ভূগোলে ৯৯ এবং সাইকোলজিতে ৯৬ নম্বর পেয়েছে। ভবিষ্যতে সাইকোলজি নিয়ে পড়ে সাইকোলজিস্ট হতে চায় অদ্রিজা। ইচ্ছে বেথুন কলেজে ভর্তি হওয়ার। অদ্রিজার কথায়, “একটা কথাই বলব, জীবনে কঠিন লড়াইয়ে সাময়িকভাবে ভেঙে পড়লেও মনে রাখতে হবে, ঘুরে দাঁড়ানোর সময় ঠিক আসে। তাই মনের জোর কখনও হারানো যাবে না।” বাবা জয়মঙ্গল গণ বলেন, “আমার থেকেও বেশি অদ্রিজার মায়ের কথাই বলতে হয়। মেয়েকে নিয়ে মুম্বই যাওয়া থেকে সেখানে থেকে চিকিৎসার পুরো লড়াইটাই ওর মা সামলেছে। স্কুলের অবদানও ভোলার নয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা, ওর মনের জোর। ক্যানসার যখন ধরা পড়ে, তখন রোগটা তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের মাঝামাঝি ছিল। সেখান থেকে আজ সুস্থ হয়ে এই ফল করেছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
  • Link to this news (প্রতিদিন)