সুচরিতা বসু
দীর্ঘ ১৫ বছর বাদে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপির সরকার। দিল্লি আর পশ্চিমবঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন সরকার আসায় নতুন করে একটা আশার সঞ্চার হয়েছে বাংলায় শিল্প ও বাণিজ্য মহলে। একটা সময়ে ‘শিল্প’ আর ‘বাংলা’ শব্দ দু’টি একসঙ্গে উচ্চারিত হতো। ইস্পাত, ইঞ্জিনিয়ারিং, ভারী শিল্প, পাট এবং অসংখ্য মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প বিকশিত হয়েছিল এই রাজ্যে। কলকাতাই ছিল পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী। কিন্তু গত কয়েক দশকে সময়ের সঙ্গে তার অবক্ষয় হয়েছে। ১৯৬০-৬১তে যেখানে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের ১২৭.৫ শতাংশ ছিল, ২০২৩-২৪য়ে তা ৮৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-৬১তে ভারতের জাতীয় জিডিপি-তে পশ্চিমবঙ্গের অবদান যেখানে ১০.৫ শতাংশ ছিল, ২০২৩-২৪তে তা কমে ৫.৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই জায়গা থেকে শিল্পক্ষেত্রে বাংলার ঘুরে দাঁড়ানোর এটাই সেরা সময়।
বাংলার শিল্পক্ষেত্রে এই পতন একদিনে, অথবা কোনও একটি দল বা একটি নীতির কারণে হয়নি। এটি কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ফল। ষাট এবং সত্তরের দশকের শেষদিকের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, তারপরে কট্টরপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন, ঘনঘন কারখানায় লকআউটের সংস্কৃতি বাংলায় পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার ভূমিসংস্কার এবং গ্রামীণ বিকাশে উদ্যোগী হলেও, প্রথমদিকে তারা বড় বেসরকারি পুঁজি ও বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে অতিমাত্রায় সতর্ক ছিল। সেই সময় থেকেই পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির তুলনায় বাংলা পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। শেষমেশ বাম জমানার শেষ দিকে সিঙ্গুরে টাটা মোটরসকে আনার চেষ্টা হলেও তৎকালীন বিরোধীদের লাগাতার আন্দোলনে তা বাংলা ছেড়ে গুজরাটে পাড়ি দেয়।
২০১১তে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পরিস্থিতির বদল ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। শিল্পের জন্য বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব বার্তা দেওয়ার একটা চেষ্টা হয়েছিল ঠিকই, তবে বাস্তবে কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। নীতি আয়োগের ম্যাক্রো-ফিস্কাল সমীক্ষা বলছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২১-২২ এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত জিএসডিপি বৃদ্ধির গড় হার ছিল মাত্র ৪.৩ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ছিল ৫.৬ শতাংশ। ১৯৯০-৯১তে জাতীয় জিডিপি-তে রাজ্যের অংশ ছিল ৬.৮ শতাংশ, যা ২০২১-২২তে কমে ৫.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। কেন্দ্রীয় কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪–এর মধ্যে ৩৯টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি সমেত মোট ২,২২৭টি কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের রেজিস্টার্ড অফিস সরিয়ে নিয়েছে। গত পাঁচ দশক ধরে লাগাতার বাংলার মেধা পাড়ি দিয়েছে অন্য রাজ্যে।
এই আবহে ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচন একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। আধা শতক বাদে প্রথমবার রাজ্যে ও কেন্দ্রে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় হয়তো ইতিবাচক উন্নয়নের আশা ও গতি সঞ্চার করতে পারে, কিন্তু বাংলার প্রকৃত পুনরুত্থানের জন্য প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার কার্যকর করা, বিভিন্ন ক্ষেত্রের পুনরুজ্জীবন, প্রতিষ্ঠানগুলির পুনর্গঠন, শিল্পায়নের জন্য জমি জট কাটানো, উদ্যোগপতিদের সাহায্য করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিকাঠামোর উন্নয়ন, দ্রুত ছাড়পত্র প্রদান, বিবাদ নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করা, নিরাপদ শিল্প-সম্পর্ক গড়ে তোলা, ব্যবসা করার পরিবেশ উন্নত করা এবং বাংলার মেধা ফিরিয়ে আনা।
রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্ন থেকে রাইটার্স বিল্ডিংসে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছে নতুন সরকার। এই সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা সংক্ষেপে বলে রাখা ভালো। আগের সরকার রাইটার্স বিল্ডিংসের সংস্কারের যুক্তিতে ২০১৩–এর অক্টোবরে সচিবালয় হাওড়ার নবান্নে সরিয়ে নিয়ে যায়। এর ফলে বিবাদী বাগ এলাকার দৈনন্দিন অর্থনৈতিক ছন্দ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সচিবালয় সরে যাওয়ার ফলে এই অঞ্চলে দৈনন্দিন জনসমাগম— আধিকারিক, আবেদনকারী, আইনজীবী, কেরানি, বিক্রেতা, টাইপিস্ট, স্টেশনারি দোকান, খাবারের দোকান এবং পরিবহণ কর্মীদের উপস্থিতিও অনেক কমে যায়। বিবাদী বাগ তল্লাটের ছোট ব্যবসায়ীরাও আশায় রয়েছেন, নতুন সরকারের সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ফের চাঙ্গা হতে পারে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত গত কয়েক দশকে যথেষ্ট উন্নতি করলেও, পূর্ব ভারতকে এখনও অনেকটা পথ পেরোতে হবে। এবং সেক্ষেত্রে বাংলার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ২০২৪-২৫ এর কেন্দ্রীয় বাজেটে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘পূর্বোদয়’ উদ্যোগের সূচনা করা হয়েছে। এর সফল রূপায়ণের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ছাড়া পূর্ব ভারতের লজিস্টিক্স এবং শিল্প করিডরের বিস্তার বা উত্তর-পূর্বের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ মসৃণ ভাবে হওয়া কঠিন। তাই বাংলার আর্থিক ও বাণিজ্যিক অগ্রগতি সার্বিক ভাবে লজিস্টিক্স, বাণিজ্য, উৎপাদন এবং আঞ্চলিক সংহতির ক্ষেত্রে এক ইতিবাচক ফেলবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
সবশেষে এটা বলা উচিত, বাংলায় শিল্পের পুনর্জাগরণ কেবল স্লোগান, সম্মেলন বা নস্টালজিয়া থেকে আসবে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা। বাংলার শিক্ষিত ওয়ার্ক ফোর্স, অনুকূল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারে পৌঁছনোর প্রবেশদ্বার এবং বিশাল ক্রেতাভিত্তি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মূল চ্যালেঞ্জ হলো কাজের সঠিক রূপায়ণ। শিল্পের জন্য জমি তৈরি, লজিস্টিক্সের আধুনিকীকরণ, সুপরিকল্পিত নগরায়ন, বাণিজ্যিক পুনর্নবীকরণ, নির্দিষ্ট সেক্টর-ভিত্তিক উৎপাদন ক্লাস্টার গঠন, পুরোনো আইনের সংস্কার এবং এমন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপরে জোর দিতে হবে যেখানে ব্যবসা বা শিল্প সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলার এই নবজাগরণ স্থায়ী ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
(লেখক— ‘অ্যাকুইল’–র ম্যানেজিং পার্টনার এবং ‘কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি’র প্রাক্তন চেয়ারপার্সন)