এই সময়: বাংলার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) মামলার শুনানিতে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে নিজে সওয়াল করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে আইনজীবী হিসেবে নয়, অন্যতম মামলাকারী হিসেবে। সে দিন তাঁর গায়ে ছিল কালো চাদর। আর বাংলায় ভোট পরবর্তী হিংসা মামলায় বৃহস্পতিবার কালো কোট চড়িয়ে কলকাতা হাইকোর্টে হাজির হলেন তৃণমূলনেত্রী। ৪ মে বিধানসভা ভোটের ফলপ্রকাশের পর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে হিংসায় তৃণমূলকর্মী খুন, পার্টি অফিসে ভাঙচুরের ঘটনায় আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে এ দিন সওয়াল করেন তিনি। তবে আদালতে ঢোকা ও বেরনোর সময়ে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হলো প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। তাঁকে ঘিরে ‘চোর, চোর’ স্লোগান ওঠে। চলে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান। পাল্টা তৃণমূলপন্থী আইনজীবীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। তীব্র বাগযুদ্ধের মধ্যে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়–সহ তৃণমূলপন্থী আইনজীবী ও নিরাপত্তারক্ষীরা কোনওক্রমে কর্ডন করে মমতাকে গাড়িতে তুলে দেন।
এই মামলায় এ দিন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চ কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি। বেঞ্চের নির্দেশ, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে পুলিশকে যাবতীয় অভিযোগের প্রেক্ষিতে রিপোর্ট দিতে হবে। পরের দু’সপ্তাহের মধ্যে পাল্টা বক্তব্য জানাবেন মামলাকারীরা। তবে পুলিশকে সতর্ক করে আদালতের বক্তব্য, ভোট পরবর্তী হিংসায় কারও দোকান বা বাড়ি ভাঙা, কাউকে বাড়ি ছাড়া করা অথবা মারধর করা হলে দল না–দেখে পদক্ষেপ করতে হবে পুলিশকে। ভোট পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত অন্য একটি মামলাতেও হাইকোর্ট রাজ্যকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দেয়। দু’টি মামলাতেই পাঁচ সপ্তাহ পরে যে কোনও পক্ষ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করবে বেঞ্চ।
এ দিনই আবার বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া আইনজীবী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী কী নথি রয়েছে, সেই তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে রাজ্য বার কাউন্সিলের কাছে। যদিও এ দিন হাইকোর্টের রায়ে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে কল্যাণের পরেই রয়েছে মমতার নাম। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এ দিন ভোট পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত দু’টি আলাদা মামলার শুনানিতে মমতার পাশে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর পরে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে দাঁড়িয়ে সওয়াল করতে দেখা যায়।
এ দিনের শুনানিতে কল্যাণ অভিযোগ করেন, ২০২১–এর থেকেও বেশি হিংসা হচ্ছে এ বার। আগের বার পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের রায়ের অনুসরণে এ বারও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানান তিনি। তাঁর পরে আইনজীবী হিসেবে মমতা কিছু বলবেন বলে আদালতের কাছে অনুরোধ করেন কল্যাণ। রীতি অনুযায়ী, কোনও একটি মামলায় সিনিয়র আইনজীবীই কোনও পক্ষের হয়ে আদালতের কাছে যাবতীয় বক্তব্য তুলে ধরেন। বাকিরা তাঁকে নথিপত্র দিয়ে বা কোনও পয়েন্ট মনে করিয়ে দিয়ে সাহায্য করেন। মমতা যেহেতু আইনজীবীদের মতো কোট–গাউন, গলায় ব্যান্ড পরে সওয়াল করতে ওঠেন, তাই পিছন থেকে আইনজীবীদের একাংশ চিৎকার শুরু করেন। এক সময়ে প্রধান বিচারপতি শুনানি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। পরে অবশ্য চিৎকার–চেঁচামেচি থামে।
এরপরে মমতা বলেন, ‘আমি ১৯৮৫ থেকে আইনজীবী। ভোট পরবর্তী হিংসায় রাজ্যে ১০ জন এখনও খুন হয়েছেন। নববিবাহিত দম্পতির উপরে হামলা করে বাড়িছাড়া করা হয়েছে। হিন্দু–মুসলিম, এসসি–এসটি কেউ হামলা থেকে বাদ যাননি। এমনকী, আমাদের বাড়িতে পর্যন্ত হুমকি দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ির সামনে হল্লা চলছে। নিরাপত্তার অভাব রয়েছে সর্বত্র। বাড়ি, অফিস লুট করা হচ্ছে। আমাদের কাছে ছবিও আছে। এটা বুলডোজ়ার স্টেট নয়, এটা সংস্কৃতির রাজ্য। (আপনারা) রক্ষা করুন।’
অন্য মামলায় বিকাশ বলেন, ‘রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পরেই সংখ্যালঘুদের উপরে হামলা নেমে এসেছে। বুলডোজ়ার এনে হগ মার্কেটে হকারদের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মূর্তি ভাঙা হয়েছে। জীবনের অধিকার ও বাঁচার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।’ প্রয়োজনে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে বিচারাধীন মামলার সঙ্গে এই আবেদন যুক্ত করার আর্জি জানান তিনি। এ দিন আবেদন শুনলেও আদালত দ্রুত কোনও নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি। এজলাস থেকে বেরনোর সময়েই মমতাকে ঘিরে ক্ষোভ–বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। মমতা হাইকোর্ট থেকে বেরনোর সময়ে শুধু ‘চোর, চোর’ স্লোগান নয়, কার্যত ধস্তাধস্তিও শুরু হয়ে যায়। হাইকোর্টের গেট থেকে বেরিয়ে মমতার গাড়িতে ওঠার মধ্যে বিক্ষোভকারীদের সরাতে বেগ পেতে হয় তাঁর নিরাপত্তারক্ষী ও তৃণমূলপন্থী আইনজীবীদের।
যদিও এ নিয়ে পরে তৃণমূলনেত্রীকেই নিশানা করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে রাস্তায় মানুষ ‘চোর, চোর’ স্লোগান দেবেন, এই কাজ বিজেপি করে না। এই পরিস্থিতিও বিজেপি তৈরি করেনি। এর জন্য যদি কেউ দায়ী হয়, সেটা তৃণমূল কংগ্রেস। কৃতকর্মের ফল কখনও পিছু ছাড়ে না।’ তাঁর সংযোজন, ‘তৃণমূল এতদিন যে সব কাজ করেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া ঘটছে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, যাঁরা এই কাজ করছেন তাঁরা অধিকাংশ তৃণমূলকর্মী।’
এ দিন বিজেপির তরফে মমতার আদালতে সওয়াল করার এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আবার ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ রাজ্যের বার কাউন্সিলের কাছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জানতে চেয়েছে, আইনজীবী হিসেবে মমতার কী কী তথ্য (এনরোলমেন্ট নম্বর, কবে নথিভুক্ত, তিনি পেশাদার হিসেবে এ দিন মামলা করার জন্য কাউন্সিলের থেকে কোনও নো–অবজেকশন নিয়েছেন কি না) রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, তৃণমূলনেত্রী দলকে চাঙ্গা রাখতে নিজেই এ দিন আইনি লড়াইয়ে নামলেন। যদিও বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়ের কটাক্ষ, ‘অনেকদিন ওঁকে টিভিতে দেখাচ্ছে না। তাই মুখ দেখানোর জন্য এখন কোর্টে ছুটে এসেছেন।’
কালীঘাটে বাসভবন লাগোয়া দপ্তরে বৃহস্পতিবার মমতা দলের সাংসদদের নিয়ে বৈঠক করেন। সূত্রের খবর, সেখানে মমতা বলেন, ‘আমরা জোরদার লড়াই করেছি। ওরা (বিজেপি) একশো আইনজীবী নিয়ে এসেছিল। আদালতকক্ষে স্লোগান দিয়েছে।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি ওদের এক্সপোজ় করতে চেয়েছিলাম। এটা সুপার ইমার্জেন্সির মতো অবস্থা। ২০২৯–এর ভোটে (লোকসভা) ওরা (বিজেপি) পরাজিত হবে।’