এই সময়: রাজ্যের সব সরকারি দপ্তরের কাজকর্ম বাংলায় করার জন্য আলোচনা চলছে বহু বছর ধরেই। বিক্ষিপ্ত ভাবে দু’–একটি রাজ্য সরকারি দপ্তরের নির্দেশিকা বাংলায় প্রকাশিত হলেও স্বরাষ্ট্র, কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার (পার), অর্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কখনওই পুরোপুরি বাংলায় কোনও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। সেই ট্রেন্ড কি এ বার বদলাবে বিজেপি সরকারের হাত ধরে? সেই জল্পনা জোরদার হলো বৃহস্পতিবার কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার দপ্তরের পদোন্নতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকার সূত্র ধরে। সম্পূর্ণ বাংলায় প্রকাশিত এই নির্দেশিকা রাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে আপলোডও করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা আগামী দিনে অন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য সরকারি দপ্তরগুলিতেও ধীরে ধীরে বজায় রাখার চেষ্টা হবে বলে প্রশাসন সূত্রের দাবি। এক প্রবীণ আমলার কথায়, ‘এতদিন বিজেপিকে অবাঙালিদের দল বলে কটাক্ষ করত অন্য রাজনৈতিক দলগুলি। সেখানে নতুন সরকার যদি বাংলায় সব সরকারি দপ্তরে কাজ শুরু করতে পারে, তা হলে নিঃসন্দেহে সেটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’
‘পার’ দপ্তরের এই নির্দেশিকায় বিভিন্ন দপ্তরের আপার ডিভিশন ক্লার্ক পদমর্যাদার ৬০ জন কর্মীর পদোন্নতির জন্য বার্ষিক মূল্যায়ন রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পদোন্নতির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে তাঁদের সম্পর্কে পাঁচ দফা বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা ভিজিল্যান্স তদন্ত চলছে কি না, তাঁরা নিয়মিত সম্পত্তির হিসেব দেন কি না, এই কর্মীরা পদোন্নতি নিতে ইচ্ছুক কি না— এ সব জানিয়ে মোবাইল নম্বর-সহ একটি সম্মতিপত্রও জমা দিতে বলা হয়েছে। এই কর্মীদের পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য, রিপোর্ট আগামী ১ জুনের মধ্যে আবশ্যিক ভাবে নবান্নে পাঠাতে হবে।
পদোন্নতির এই নির্দেশিকার বিষয়বস্তু নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো গোটা নির্দেশিকা বাংলায় লেখাটা। রাজ্য প্রশাসন সূত্রের খবর, অতীতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তথ্য–সংস্কৃতি মন্ত্রী থাকাকালীন সরকারি কাজে ব্যবহৃত বাংলা ভাষার অভিধান তৈরি করিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনিক ভাবে তার কার্যকারিতা বিশেষ দেখা যায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও গোড়ায় সব সরকারি দপ্তরে বাংলা ভাষায় কাজকর্ম চালুর উদ্যোগ নেন। যদিও সেটাও পরে ধামাচাপাই পড়েছিল।
রাজ্যের এক অবসরপ্রাপ্ত আমলার কথায়, ‘বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জমানায় তৎকালীন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন সচিব মানবেন্দ্রনাথ রায় পঞ্চায়েত দপ্তরের সব নির্দেশিকায় বাংলার ব্যবহার চালুর উদ্যোগ নেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পঞ্চায়েত প্রধান বা সদস্য, পঞ্চায়েত সমিতি অথবা জেলা পরিষদ স্তরে ইংরেজিতে নির্দেশিকা জারি হলে তার মর্মার্থ বুঝতে পারবেন না অনেকেই। তাতে সরকারি কাজই ঠিক ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পঞ্চায়েতের পাশাপাশি তথ্য–সংস্কৃতি দপ্তরেও কিছু কিছু নির্দেশিকায় বাংলার ব্যবহার চালু হয়েছে গত কয়েক বছরে।’ তবে নবান্নের এক কর্তার যুক্তি, স্বরাষ্ট্র, ‘পার’ বা অর্থের মতো দপ্তরে বাংলায় আইনি শব্দ চয়নে অনেক সময়েই সমস্যা তৈরি হয়। তাই বাংলায় নির্দেশিকা জারি করা সম্ভব হয় না সব সময়ে। ভিন রাজ্যের আমলারাও অনেক ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। সে সব মাথায় রেখেও যে ভাবে এ দিন ‘পার’ দপ্তরের নির্দেশিকা বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে, তাতে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধির আশা দেখছেন অনেকেই।