• মেধায় মাত অভাবী পুত্রের
    আনন্দবাজার | ১৫ মে ২০২৬
  • মাঝে মাঝে চোখ জ্বালা করত। উনুনের তাপে, না একা থাকার কষ্টে, সংশয় হত নিজেরই। চোখ মুছে দ্রুত রান্না চড়াতেন। স্নান-খাওয়া সেরে, বাসন ধুয়ে ছুটতেন ভাগীরথীর ঘাটে। খেয়া পেরিয়ে, অটো বা টোটো ধরে স্কুলে। বাড়ি ফিরে সাত-আট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যেতে হত টিউশনে। ফিরে আবার ভাত ফুটিয়ে খাওয়া।

    পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সাগর মণ্ডলের বছর দুয়েক এটাই ছিল দিনলিপি। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিকের ফলে মেধাতালিকায় নবম স্থানে নাম রয়েছে তাঁর। বাবা-মা পরিযায়ী শ্রমিক। পরীক্ষার পরে গুজরাতে বাবা-মায়ের কাছে চলে গিয়েছেন সাগর নিজেও। একটি হোটেলে থালা-বাসন ধোয়ার কাজ নিয়েছেন। মাস শেষে ১৫ হাজার টাকা আসবে হাতে। ভবিষ্যতে, স্নাতক স্তরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়া এবং তার পরে ইউপিএসসি-র পরীক্ষায় বসার প্রশিক্ষণ নিতে সহায় হবে এই টাকা, আশা সাগরের।

    নদিয়ার নৃসিংহপুরের বড়ডাঙাপাড়ায় একতলা বাড়ি মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল ও সুষমা মণ্ডলের। তাঁদের তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সাগর ছোট। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। অভাবের তাড়নায় বছর দুয়েক আগে গুজরাত চলে যান দম্পতি। মৃত্যুঞ্জয় একটি হোটেলের সাফাইকর্মী ও সুষমা এক বেসরকারি হাসপাতালে সাফাইকর্মীর কাজ নেন। তখন ঠাকুমার সঙ্গে বাড়িতে থাকতেন সাগর। কিন্তু বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে ছোট ছেলের কাছে চলে যান। এর পরে একা থেকে পড়াশোনা চালিয়েছেন সাগর। মাধ্যমিকে পেয়েছিলেন ৬৪৬। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার খরচ বেশি। তাই কলা বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন। উচ্চ মাধ্যমিকে পেয়েছেন ৪৮৮ (৯৭.৬%)। বাংলায় ৯৬, ইংরেজিতে ৯৯, ভূগোলে ৯৮, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৯৬ এবং অর্থনীতিতে ৯৯। ফল বেরোনোর পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে, কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘‘দারিদ্র আর প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রতি পদে। তবে তা জেদ বাড়িয়েছিল। কিন্তু মেধাতালিকায় নাম থাকবে, ভাবিনি!’’

    আমদাবাদে একটি মেট্রো স্টেশনের কাছে একচিলতে ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গে রয়েছেন সাগর। সে ঘরের ভাড়া মাসে ছ’হাজার টাকা। আলাদা সময়ে কাজে বেরোন বাবা-মা। এ দিন হোটেলের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে মোবাইলে চোখ রেখেছিলেন সাগর। ফল জানার পরে বলেন, “এ বার দিল্লি গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হওয়ার জন্য ভর্তি হব। সেই সঙ্গে, ওখানে কোচিং সেন্টারে ইউপিএসসি-র পরীক্ষার প্রস্তুতি নেব।” তিনি জানান, হোটেলে কাজ করে পাওয়া বেতন জমাচ্ছেন। মা-বাবা কিছু টাকা দেবেন। স্বপ্নপূরণে তা-ই ভরসা। বাবা-মা বলছেন, ‘‘ছেলে খুব কষ্ট করেছে। ওকে বলেছি, পরিশ্রম করলে ফল মিলবেই।’’

    কালনা মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক মিলন মান্ডি বলেন, ‘‘অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সাগরের এই সাফল্য অনেককে পথ দেখাবে।’’ সাগরের পড়শি রূপম মান্নার কথায়, ‘‘ভাল কিছু করার জন্য ছোট থেকে ওর জেদ দেখেছি। ওর লড়াই দৃষ্টান্ত হোক।’’ আর সাগর বলছেন, ‘‘আমার মতো যারা অভাবের সঙ্গে লড়ছে, আইএএস উত্তীর্ণ হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)