• আর্থিক ও শারীরিক বাধা কাটিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে সাফল্যের জয়যাত্রা
    আনন্দবাজার | ১৫ মে ২০২৬
  • পার্ক সার্কাসের নাসিরুদ্দিন রোডের ফুটপাতে ছোট্ট চায়ের দোকান। সেখানে এক কিশোরকে সন্ধ্যায় দেখা যেত ক্রেতাদের চা দিচ্ছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বই নিয়েও পড়ত সে। সেই কিশোর, গোলাম ফয়জল উচ্চ মাধ্যমিকে ৪৯৩ নম্বর পেয়ে চতুর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, ৯৮.৬ শতাংশ। ক্যালকাটা মাদ্রাসা এপি ডিপার্টমেন্টের ছাত্র গোলাম স্কুল থেকে রেজাল্ট নিয়ে বাড়ি ফেরার আগে চায়ের দোকানে এসেছিল। সেখানে বসেই সে বলল, ‘‘ভাল ফল হবে জানতাম। কিন্তু চতুর্থ হব, ভাবিনি। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে চাই।’’

    চা তৈরি করা এবং কোন ক্রেতা কত কাপ চা খাচ্ছেন, ক’টা বিস্কুট নিচ্ছেন— সেই হিসাবের পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট্যান্সির কঠিন ব্যালান্স শিটও গোলাম সহজেই করে দেয়। ‘‘বাবা সকাল থেকে দোকানে থাকেন। আমি বিকেল পাঁচটা থেকে সাতটা পর্যন্ত দোকানে বসি। তখন বাবা একটু বিশ্রাম নিতে যান। পরীক্ষার ঠিক আগে অবশ্য বাবা দোকানে বসতে নিষেধ করতেন। আমি সন্ধ্যার ওই দু’ঘণ্টা রাতের দিকে পড়ে নিতাম।’’ গোলাম মনে করে, অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়াশোনা করে ভাল নম্বর পায়। তবে, সেই কঠিন পথে এমন মানুষও থাকেন, যাদের সাহায্য ছাড়া এগোনো যায় না। তার ক্ষেত্রে পরিবার এবং স্কুলের শিক্ষকদের অবদান ভোলার নয়।

    নিউ আলিপুরের শ্রীসারদা আশ্রম বালিকা বিদ্যালয়ের মৌপিয়া পাল ৪৮৯ পেয়ে অষ্টম হয়েছে। রাশিবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চায় মৌপিয়া। বাবা পার্থপ্রতিম পাল বলেন, ‘‘২০০৯ সাল থেকে আমি কর্মহীন। কোভিডের আগে একটা কাপড়ের দোকান ছিল। সেটিও কোভিডের পরে আর চালাতে পারিনি।’’ মৌপিয়া বলল, ‘‘ইউটিউবের বিনামূল্যের ভিডিয়ো ক্লাস, চ্যাট জিপিটি-র সাহায্যে পড়াশোনা করেছি। বাড়ির লোক আর স্কুল যেমন পাশে ছিল, তেমনই দুই গৃহশিক্ষকও কার্যত বিনামূল্যে পড়িয়েছেন।’’ মৌপিয়া জানায়, তৃতীয় সিমেস্টারে দু’নম্বরের জন্য সে মেধা তালিকায় আসতে পারেনি। তাই চতুর্থ সিমেস্টারে মেধা তালিকায় আসার জেদ চেপে গিয়েছিল।

    তৃতীয় সিমেস্টারে নবম হয়েছিল সে। চতুর্থ সিমেস্টারে ৪৮৭ পেয়ে দশম হয়ে নিজেকে উচ্চ মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় ধরে রাখল নিমতা থানা এলাকার উদয়পুর সাউথের বাসিন্দা, ক্যানসারজয়ী অদ্রিজা গণ। রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুলের এই ছাত্রীর ষষ্ঠ শ্রেণিতেই টি সেল লিম্ফোমা ধরা পড়ে। কিন্তু একাদশ ও দ্বাদশে এক দিনও স্কুল কামাই করেনি সে। বাবা জয়মঙ্গল বলেন, ‘‘তখন চার বছর ধরে ৮২টি কেমো দিতে হয়েছিল। শেষ কেমো নিয়েছিল ১৮ জুন, ২০২১ সালে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, পাঁচ বছরে যদি অসুখটা ফিরে না আসে, তা হলে ওকে আর ওষুধ খেতে হবে না। পাঁচ বছর হয়ে গেল। এখন ওকে কোনও ওষুধ খেতে হয় না। তবে, বছরে এক বার চেক-আপ করাতে হয়।’’ অসুস্থতার জন্য অনেক বিধিনিষেধের পাশাপাশি রাত জাগাও বারণ অদ্রিজার। উচ্চ শিক্ষায় অদ্রিজা মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়তে চায়।

    ৪৮৮ নম্বর পেয়ে নবম হয়েছে স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র অমৃতাংশু সাহু। চিকিৎসক হতে চায় সে। অমৃতাংশু বলল, ‘‘খুব ভাল প্রস্তুতি নিয়ে নিট দিয়েছিলাম। পরীক্ষাও ভাল হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের জন্য নিট বাতিল হয়ে গেল। ফের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। দ্বিতীয় বারের পরীক্ষা প্রথম বারের মতো ভাল না-ও তো হতে পারে। কিন্তু ফের পরীক্ষা দিতেই হবে।’’ তার প্রশ্ন, নিটের মতো পরীক্ষার পরিকাঠামোয় এত ফাঁক থাকবে কেন? অমৃতাংশুর বাবা চঞ্চল সাহু বলেন, ‘‘আমরা নিরুপায়। যা নিয়ম, তা মানতেই হবে। যাঁরা পরীক্ষা নিচ্ছেন, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার।’’ পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট অমৃতাংশু।

    বরাহনগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম হাইস্কুলের ছাত্র সমৃদ্ধ পাল ৪৮৭ নম্বর পেয়ে দশম হয়েছে। সে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। সমৃদ্ধ মনে করে, প্রতিটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পড়ায় এই সাফল্য এসেছে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)