সোশ্যাল মিডিয়া বাড়াচ্ছে দূরত্ব, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক ভাঙন নিয়ে ছবি রাজাদিত্যর
এই সময় | ১৫ মে ২০২৬
মানুষের একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আধুনিক জীবনের অদৃশ্য মানসিক ক্লান্তিকে কেন্দ্র করে নতুন ছবি নিয়ে আসছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব, বাড়তে থাকা দূরত্বের কথা বলবে এই ছবি
দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক মানুষ, হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতি এবং সমাজের অদেখা বাস্তবতা নিয়ে কাজ করার পর এ বার পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছেছেন মানুষের ভিতরের অন্ধকারে। তাঁর নতুন ছবিতে উঠে আসবে এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে দ্রুত যোগাযোগের মধ্যেও মানুষ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে। পরিচালকের কথায়, ‘আমরা এখন খুব দ্রুত যোগাযোগ করি, কিন্তু খুব কম সংযোগ তৈরি করি।’ তাঁর মতে, বর্তমান সমাজে অবসাদ শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি গভীর ভাবে সামাজিক বাস্তবতার অংশ। তাই তাঁর নতুন ছবিকে তিনি শুধুমাত্র ‘ডিপ্রেশন নিয়ে সিনেমা’ বলতে নারাজ তিনি। বরং এটি মানুষের মানসিক দূরত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং নীরব ভাঙনের গল্প, বক্তব্য রাজাদিত্যর।
পরিচালকের কথায়, ছবিটির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডে থাকার সময়ে দীর্ঘ শীত, কম আলো, সাংস্কৃতিক দূরত্ব এবং নিঃসঙ্গতা তাঁকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। পরিচালক নতুন ছবির নির্মাণশৈলীও বাস্তবসম্মত রাখার চেষ্টা করেছেন। কম আলো, রিয়েল লোকেশন, দীর্ঘ নীরব দৃশ্য এবং শহরের ক্লান্ত আবহ— এসবের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে এক ধরনের অন্তর্মুখী চলচ্চিত্রভাষা। পরিচালক মনে করেন, ‘অনেক সময়ে নীরবতাই সবচেয়ে বড় সংলাপ।’ তাঁর চলচ্চিত্রে বরাবরই উঠে এসেছে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন। পুরুলিয়ার নাচনি শিল্পী, কলকাতার বিলুপ্তপ্রায় পেশা কিংবা হারিয়ে যেতে বসা ভাষাকে কেন্দ্র করে নির্মিত তাঁর তথ্যচিত্রগুলি প্রশংসিত হয়েছে। ‘ওয়াটারওয়ালা’, ‘অচ্ছুৎ’ এবং ‘লস্ট ফর ওয়ার্ডস’-এর মতো কাজ নানা মহলেও সমাদৃত হয়।
তবে এ বার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন শহুরে মানুষ এবং তাঁদের নীরব মানসিক সংকট। সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব, নকল সুখের প্রদর্শন এবং মানুষের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা দূরত্বও ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। কলকাতার ভেজা রাস্তা, পুরোনো ট্রামলাইন, রাতের আলো কিংবা জানলার ধারে একা বসে থাকা মানুষ, এসব তাঁর ছবিতে শুধুমাত্র দৃশ্য নয়, বরং সময় ও মানসিক অবস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে। পরিচালক মনে করেন, আধুনিক শহুরে জীবনে মানুষ ক্রমশ নিজেদের ভিতরে বন্দি হয়ে পড়ছেন। তাই তাঁর নতুন ছবিতে কোনও সমাধান বা অতিরিক্ত নাটকীয়তা নেই। বরং রয়েছে নীরবতা, অপেক্ষা এবং মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবমুখী এই ছবিটি ইতিমধ্যেই সিনে–মহলে আগ্রহ তৈরি করেছে। পরিচালকের মতে, এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং বর্তমান সময়ের নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে এক মানবিক কথোপকথন। ছবিটির বেশ কিছু দৃশ্য দীর্ঘ সময় ধরে রিয়েল লোকেশনে শুটিং করা হয়েছে। যাতে অভিনয়ের চেয়ে স্বাভাবিক অভিব্যক্তি বেশি ফুটে ওঠে। রাজাদিত্য বিশ্বাস করেন, বাস্তব জীবনকে জোর করে তৈরি করা যায় না। তাকে সময় নিয়ে বুঝতে হয়।