• UAE-তে ৫২%, আমেরিকাতে ৪৪%, অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে কতটা মহার্ঘ হলো জ্বালানি?
    এই সময় | ১৫ মে ২০২৬
  • ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ এবং হরমুজ় প্রণালী ঘিরে চলা অস্থিরতার মধ্যে শুক্রবার থেকে ভারতেও লিটার প্রতি তিন টাকা করে বেড়ে গেল জ্বালানির দাম। বিশ্বজুড়ে পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম যখন লাগামছাড়া হারে বেড়েছে, তখন ভারত তুলনামূলকভাবে সাধারণ মানুষকে অনেকটাই সুরক্ষা দিয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রের। নরেন্দ্র মোদী সরকারের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যাপকভাবে বাড়লেও ভারত দীর্ঘ সময় ধরে সেই চাপ পুরোপুরি জনগণের উপর চাপায়নি।

    শুক্রবার কেন্দ্র সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা করে। গত চার বছরে এই প্রথম এক ধাক্কায় জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হলো। সরকারের দাবি, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ় প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। সেই তুলনায় বিশ্বের বাকি প্রধান দেশগুলির মধ্যে ভারতেই সর্বনিম্ন হারে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো। অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে দাম বেড়েছে ৫২ শতাংশ। আমেরিকায় দাম বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।

    NDTV-র রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করত, ব্যারেল প্রতি তার গড় দাম ছিল প্রায় ৬৯ ডলার। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত বাড়ার পরে সেই দাম বেড়ে ১১৩ থেকে ১১৪ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিছু সময়ের জন্য ব্রেন্ট ক্রুড ১২০ ডলারও ছাড়িয়ে যায়।

    এই পরিস্থিতিতেও ভারত ৭৬ দিন ধরে জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। এর জেরে কেন্দ্র ও তেল বিপণন সংস্থাগুলি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

    বর্তমানে দিল্লিতে পেট্রলের দাম হয়েছে লিটার প্রতি ৯৭.৭৭ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯০.৬৭ টাকা। কলকাতায় পেট্রল ১০৮.৭৪ টাকা এবং ডিজেল ৯৫.১৩ টাকা। মুম্বইয়ে পেট্রল ১০৬.৬৮ টাকা, ডিজেল ৯৩.১৪ টাকা। চেন্নাইয়ে পেট্রল ১০৩.৬৭ টাকা এবং ডিজেল ৯৫.২৫ টাকা হয়েছে।

    কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু তুলনামূলক একটি চার্ট শেয়ার করে দাবি করেছেন, বিশ্বের বহু দেশে যেখানে জ্বালানির দাম ২০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, সেখানে ভারতে পেট্রলের দাম বেড়েছে মাত্র ৩.২ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৩.৪ শতাংশ। তাঁর বক্তব্য, ‘বিশ্ব যখন জ্বালানি সঙ্কটে কাঁপছে, তখন ভারত আলাদা ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।’

    কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এটি সচেতন সিদ্ধান্ত। ভারত তার অপরিশোধিত তেলের ৮০-৮৫ শতাংশ আমদানি করে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি বিলের সঙ্গে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়।

    ভারতের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল আমদানির খরচ ইতিমধ্যেই আনুমানিক ১২-১৫ লক্ষ কোটি টাকা। তা ছাড়া, সোনা আমদানি বেড়ে প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর একে সাঁড়াশি আক্রমণ বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তা সত্ত্বেও, ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্য কেন্দ্র এর আগে পেট্রলের ওপর ৮ টাকা এবং ডিজেলের ওপর ৬ টাকা আবগারি শুল্ক কমিয়েছিল ।

    রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ভারত শুধু দাম নিয়ন্ত্রণের পথেই হাঁটেনি, পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ের আবেদনও জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমাতে, সম্ভব হলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে এবং জ্বালানি ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

    ভারতের মতোই এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ের পথে হাঁটছে। তবে ভারত তুলনামূলকভাবে সাধারণ মানুষের উপর কম চাপ দিয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।

    কমবেশি ৮২টি দেশ জ্বালানি সঙ্কট থেকে বাঁচতে জরুরি বিধিনিষেধ, রেশনিং ব্যবস্থা কিংবা ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি আরোপ করেছে। ভারত এর কোনওটিই করেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান ৩ টাকার মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রাক্তন পেট্রোলিয়াম সচিব আরএস পাণ্ডে জানিয়েছেন, তেল সংস্থাগুলির উপর এখনও ব্যাপক আর্থিক চাপ রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়লে সরকারকে আবার পদক্ষেপ করতে হতে পারে। তাঁর মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মুদ্রাস্ফীতিতেও পড়বে।

    জানা গিয়েছে, হরমুজ় প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের খরচ প্রতি যাত্রায় ২০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবুও, এখানকার পন্থা হলো জনগণকে বোঝানো, আতঙ্কিত করা নয়।

    সরকারি তেল সংস্থাগুলি—Indian Oil Corporation, Bharat Petroleum এবং Hindustan Petroleum—২০২২ সালের এপ্রিলের পর থেকে কার্যত নিয়মিত মূল্য পরিবর্তন বন্ধ রেখেছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সেই বোঝা পুরোপুরি চাপানো হয়নি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে একবার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ২ টাকা কমানো হয়েছিল।

    তবে বিরোধীরা এই মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, নির্বাচন শেষ হতেই সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি বোঝা চাপানো হয়েছে। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘এ বার সামনে এগোনোর একমাত্র রাস্তা সাইকেল।’

  • Link to this news (এই সময়)