পাথরের থাম। তাতে খোদাই করা দেব-দেবীর কারুকার্য। বড় হলঘরের ছাদকে ধরে রেখেছে এমনই কয়েক শত স্তম্ভ। হাজার হাজার বছর আগে এখানে শীতলপাটি পেতে পড়াশোনা করতেন ছাত্রছাত্রীরা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো। পূজিত হতেন দেবী সরস্বতী। তার পরে বিদেশি আগ্রাসনে এই ভোজশালা মন্দিরের রূপ বদলে যায়। তরোয়ালের কোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ছিন্নভিন্ন করে ভোজশালা মন্দির হয়ে ওঠে ‘ভোজশালা মন্দির কামাল মওলা কমপ্লেক্স।’ শুক্রবার রায় দিতে গিয়ে অনেকটা এমনই বলেছে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট।
প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর সময়ে ভোজশালা মন্দির নিয়ে বিতর্ক শুরু হতো। এটা মসজিদ নাকি মন্দির? প্রতি মঙ্গলবার এখানে হিন্দুরা পুজো করতেন। আর শুক্রবার নমাজ পড়তেন মুসলিমরা। বাকি দিনে ঢুকতে পারতেন যে কেউ। তবে পুজো বা নমাজের অনুমতি মিলত না। মামলার পরে হাইকোর্টের নির্দেশেই মন্দিরে সমীক্ষা চালায় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। তার পরে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত জানিয়েছে, বিতর্কিত অংশ আসলে মন্দিরই। মুসলিম পক্ষকে অন্য স্থানে নমাজ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিচারপতিরা।
যীশু খ্রিস্টের জন্মের হাজার বছর আগের কথা। সেটা ১০৩৪ খ্রিস্টাব্দ। সেই সময়ে ভারতের মালবার রাজ্য (আজকের মধ্যপ্রদেশের ধার অঞ্চল) শাসন করছেন পারমার বংশের রাজা ভোজ। তিনি ছিলেন ৭২ কলা এবং ৩৬ প্রকার অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। ধারকে শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন নালন্দা, তক্ষশীলার মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে। শুরু হলো কাজ। ধীরে ধীরে মাথা তুলল এক বিশাল মন্দির।
পুরো মন্দিরটাই হলঘরের মতো। সেগুলোকে ধরে রেখেছে অসংখ্য স্তম্ভ। তাতে দেব-দেবীর কারুকার্য খোদাই করা। জালি কাটা জানলা। ছাদের মাঝে গম্বুজ। মন্দিরের সামনে অনেকটা খোলা জায়গা। তার মাঝে যজ্ঞকুণ্ড। সকাল, সন্ধ্যায় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মন্ত্রধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত গোটা চত্বর। পুরো মন্দিরটাই তৈরি লাল বেলে পাথর বা স্ট্যান্ড স্টোনে। তা থেকে যেন একটা গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ছে। বৈদিক সভ্যতায় জ্ঞানের দেবী সরস্বতীকে উৎসর্গ করা হয় এই মন্দির।
১০৩৫ খ্রিস্টাব্দে বসন্ত পঞ্চমীর দিনে দেবী সরস্বতীর বিগ্রহ স্থাপন করে শুরু হয় পড়াশোনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসতেন এখানে। সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন, তর্কশাস্ত্রের পাশাপাশি এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ এবং বিজ্ঞানের চর্চাও চলত সমানতালে। এখানেই প্রথম শৈব দর্শনের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন কাশীর পণ্ডিত ভববৃহস্পতি। ‘সুরি’ উপাধি পেয়েছিলেন জৈন পণ্ডিত অভয়দেবজি। এই মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে কালিদাস, ভবভূতি, বাণভট্ট, মাঘ, ধনপালের নামও। যদিও কালিদাস, ভবভূতি এবং বানভট্ট ভিন্ন সময়ের মানুষ। তবে দাবি এমনই।
ভোজশালার পাথর আজও যেন কথা বলে। সরকারি নথি অনুযায়ী, বর্তমান কামাল মওলা মসজিদ কমপ্লেক্সের মধ্যেই প্রাচীন সরস্বতী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। মসজিদের খোলা প্রাঙ্গণ, স্তম্ভঘেরা করিডর এবং পশ্চিম দিকের নামাজের অংশে এখনও রয়েছে ভোজশালার খোদাই করা স্তম্ভ ও ছাদের নিদর্শন। শিলালিপিগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও বিষ্ণুর কূর্ম অবতারের বর্ণনা, কোথাও সংস্কৃত ব্যাকরণ, বর্ণমালা, ক্রিয়াপদের রূপের উল্লেখ। সহজ ভাবে শেখানো হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। একটি কালো পাথরের ফলকে খোদাই করা রয়েছে সংস্কৃত নাটক ‘কর্পূরমঞ্জরী’। এটি লিখেছিলেন রাজগুরু মদন।
চতুর্দশ শতকে একের পর এক বিদেশি আক্রমণ শুরু হলো মালবায়। ১৩০৫ সালে পারমারদের পরাজিত করেন আলাউদ্দিন খিলজি। ধ্বংসের মুখে পড়ে ভোজশালা-সহ বহু ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান। তখন থেকেই ধীরে ধীরে মন্দিরের পরিচয় বদলের চেষ্টা শুরু হয় বলে অভিযোগ। ১৫১৪ সালে মেহমুদ শাহ খিলজি (২) ভোজশালাকে ভেঙেচুরে সরাসরি মসজিদে বদলে ফেলার কাজ শুরু করেন। মন্দির চত্বরের বাইরে তিনি তৈরি করেন কামাল মওলার সমাধি। যদিও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, কামাল মওলার মৃত্যু হয়েছিল তারও দুই শতাব্দী আগে, ১৩১০ সালে।
এর সঙ্গে জুড়ে যায় ব্রিটিশরাও। ১৮৭৫ সালে মন্দিরে খননকার্জ চালান ব্রিটিশ অফিসার মেজর জেনারেল উইলিয়াম কিনকেড। তিনি বাগদেবীর ভাঙা মূর্তি খুঁজে পান। সেটি উদ্ধার করে তিনি নিয়ে চলে যান লন্ডনে। গত দেড়শোরও বেশি সময় ধরে সেটি ব্রিটিশ মিউজ়িয়ামে রাখা রয়েছে। এ দিন সে মূর্তিটিও ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট।
ভোজশালা মন্দির নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের বিরোধের সূত্রপাত ঘটে বিংশ শতকে। ১৯৩৬ সালে এখানে নমাজ পড়ার অনুমতি চান মুসলিমরা। যদিও হিন্দুদের তীব্র বিরোধের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এই বিরোধ চলেছে ১৯৪২ পর্যন্ত। পরে মুসলিমদের আলাদা জমি দেন ধারের তৎকালী রাজা আনন্দ রাও পাওয়ার (চতুর্থ)। তৈরি হয় রেহমত মসজিদ। কিন্তু তার পরেও ভোজশালার দাবি ছাড়েননি মুসলিমরা। নিজেদের দখল ধরে রাখতে ১৯৫২ সাল থেকে প্রতি বসন্ত পঞ্চমীতে ফের পুজো শুরু করেন হিন্দুরা। একই সঙ্গে সরস্বতীর বিগ্রহ ফিরিয়ে আনার দাবিও উঠতে শুরু করে।
ভোজশালা মন্দির শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাও নয়। এটা এমন এক বহুমাত্রিক ইতিহাস, যেখানে জ্ঞান, ধর্ম, ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। এর পাথরে খোদাই রয়েছে শ্লোক, দেওয়ালে রয়েছে আঘাতের চিহ্ন। এর নীরবতা প্রশ্ন তুলছিল — রাজা ভোজ যে স্থানকে জ্ঞানের মন্দির হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, তা কি কোনওদিন আবার সেই মর্যাদা ফিরে পাবে? অবশেষে তার উত্তর মিলল।