‘গল্প হলেও সত্যি’! ইডি-র হাতে গ্রেপ্তার হওয়া কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ওঠা ভূরি ভূরি অভিযোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে আদালতে সওয়ালের শুরুটা এই ভাবেই করলেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আইনজীবী। তিনি অভিযোগ করলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখল করে অবৈধ নির্মাণের কারবার চালিয়ে যাওয়ার জন্য শান্তনুরা একটি ‘নেক্সাস’ বা চক্র গড়ে তুলেছিলেন। সেই চক্রে ছিলেন বেহালার ধৃত ব্যবসায়ী জয় কামদার এবং সোনা পাপ্পু। এও অভিযোগ, জড়িত ছিলেন রাজ্যের পূর্বতন শাসকদলের অনেক নেতা এবং লালবাজারের বেশ কয়েক জন পুলিশকর্তা। গোটা কারবারে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছে ইডি।
বৃহস্পতিবার প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পরে শান্তনুকে রাতে গ্রেপ্তার করে ইডি। তার পর শুক্রবার কলকাতার বিচার ভবনের বিশেষ ইডি আদালতে হাজির করানো হয় তাঁকে। তাঁকে ১৪ দিনের জন্য ইডি-র হেফাজতে নিয়ে জেরার আবেদনও করা হয়। কেন ১৪ দিনের জন্য হেফাজতে চাওয়া হচ্ছে, তারই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইডির আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী আদালতে বলেন, ‘গোটা ঘটনা বললে আপনি ভাববেন, আমি গল্প বলছি। কিন্তু নাহ্। এটা গল্প হলেও সত্যি। কী ভাবে দুর্নীতি হয়েছে, তা জানাচ্ছি। নেক্সাস ছিল। গল্প ছিল।’
রিয়েল এস্টেট প্রতারণা মামলায় আগেই কামদারকে গ্রেপ্তার করা করেছে ইডি। ইডি-র দাবি, তিনি শান্তনুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ইডি জানায়, আর এক অভিযুক্ত সোনা পাপ্পু এখনও বেপাত্তা। শুক্রবার ইডি আদালতে জানিয়েছে, কামদারের নির্মাণ এবং রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ছিল। তার জন্য চুক্তিও হতো। অনেক সময়ে কম দামে বিক্রি করতেও বাধ্য করা হতো। এর জন্য কাজে লাগানো হতো প্রভাবশালীদের। ধীরাজ বলেন, ‘কম দামে জমি বিক্রি না করলে সোনা পাপ্পু হুমকি দিত। জয় কামদারের চ্যাট এবং কিছু ডিজিটাল তথ্য থেকেই এ সব জানা গিয়েছে। আর জমি হাতানোর কাজে কামদারকে সুবিধা করে দিতেন এই পুলিশকর্তা।’
ইডি জানিয়েছে, ডিসিপি শান্তনু এক সময়ে কালীঘাট এবং হেয়ার স্ট্রিট থানায় ছিলেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, শান্তনুর স্ত্রী এবং সন্তানের নামে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ব্যবসা রয়েছে। পুলিশকর্তার বাড়িতে তল্লাশি অভিযানের পর তাঁর ছেলের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। তিন বার লেনদেনের তথ্য মিলেছে। একবার ২১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার। আর এক বার ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকার। তৃতীয় বারের লেদেন ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার। ইডির আইনজীবী বলেন, ‘শহরের ওসিদের বদলিতে প্রভাব ছিল পুলিশকর্তার। ওঁকে একটি ঘড়ি দিয়েছিলেন কামদার। যার দাম কোটি টাকার উপর। পুলিশকর্তা এবং তার পরিবারকে টাকা দেওয়া হতো। ওঁর ইচ্ছা অনুযায়ীই, পুলিশকর্তাদের বদলি করা হতো। কালীঘাট, উল্টোডাঙা, রবীন্দ্র সরোবর, ফুলবাগান-সহ বিভিন্ন এলাকায় জমি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজে ক্যান্টিন চালাতেন ওঁর স্ত্রী। সেখান থেকেও কোটি কোটি টাকা ঢুকেছে।’
ইডির অভিযোগ, শান্তনুদের জমি জালিয়াতির চক্রে কলকাতার একাধিক কাউন্সিলার জড়িত। ধীরাজ বলেন, ‘কেউ বিল্ডিং বানানোর কাজ শুরু করলে কাউন্সিলারের অফিসে যেতে হতো। সেখানে নগদ টাকা দেওয়া হতো। তাঁদের অনুমতি ছাড়া কাজ শুরু করা যেত না। লোকাল থানাতেও মাসে মাসে টাকা দিতে হতো, যাতে পুলিশ কাজে বাধা না দেয়। ব্যাঙ্কিং চ্যানেল গড়ে উঠেছিল।’ ইডির দাবি, শান্তনু এমন একটি ছাতা তৈরি করেছিলেন, যার ছত্রছায়ায় থেকেই বাকিরা দুর্নীতি করেছেন। তাই তাঁকে ছাড়া হলে প্রচুর তথ্যপ্রমাণ লোপাট হতে পারে। বাকি পুলিশের উপর প্রভাব খাটানোও হতে পারে, এই আশঙ্কা করেই ১৪ দিনের ইডি হেফাজতের আবেদন করেছেন ধীরাজ। তাঁর দাবি, সোনা পাপ্পু, জয় কামদার ও শান্তনুর মধ্যে লেনদেনের অঙ্ক ১০ কোটি টাকারও বেশি।
তদন্তকারী সংস্থার আবেদনের বিরোধিতা করেছেন শান্তনুর আইনজীবী সাবির আহমেদ। তাঁর মক্কেল কোনও নেক্সাসের সঙ্গেই জড়িত নন। সাবির বলেন, ‘ইডি আমার মক্কেলের বাড়িতে দু’বার গিয়েছিল। তথ্য, ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে গিয়েছে। আমার মক্কেলের ছেলের বয়ান নিয়েছে। ২০ লক্ষ আর ৩ লক্ষ টাকা দু’টি প্রপার্টির জন্য দেওয়া হয়েছিল। আমার মক্কেল একজন অফিসার। ঊর্ধ্বতনের নির্দেশে কাজ করতে হয়। কাউকে আটক করার জন্য যথার্থ কারণ থাকতে হয়। আমার মক্কেলের ভূমিকা কী, সেটা কোথাও বলা হচ্ছে না। আমি জামিনের আবেদন জানাচ্ছি। প্রথম দিন নোটিস পাওয়ার পর তা ঊর্ধ্বতনকে পাঠাই। সেটা স্ক্রুটিনির পর আমার মক্কেলকে ইডির সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আমার মক্কেল শৃঙ্খলার মধ্যে বদ্ধ। আমার পরিবারকে কেন হেনস্থা করা হচ্ছে? আমার মক্কেলের ছেলের নিয়োগ, স্ত্রীর ব্যবসা করার কি অধিকার নেই? আমার মক্কেলের বাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য টাকার পাঠানোয় ভুল কোথায়?
এই মামলায় আদালত এখনও কোনও নির্দেশ দেয়নি।