নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও বরানগর: উর্দুতে পেয়েছেন ১০০। ইংরেজিতে ৯৮, হিসাবশাস্ত্রে ৯৬, বিজনেস স্টাডিজে ৯৯ ও অর্থনীতিতে ১০০। এই হল উচ্চ মাধ্যমিকে কলকাতা জেলায় প্রথম স্থানাধিকারী গোলাম ফয়জলের মার্কশিট। ৫০০ তে তাঁর প্রাপ্তনম্বর ৪৯৩। ক্যালকাটা মাদ্রাসা এপি ডিপার্টমেন্টের ছাত্র গোলাম। তিনি কলকাতায় প্রথম ও রাজ্যের মধ্যে চতুর্থ স্থানাধিকারী। এবছর মাধ্যমিকে কলকাতার কোনো স্কুলের পড়ুয়া মেধা তালিকায় জায়গা করতে পারেননি। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকে গোলামের মতো আরও তিন কৃতী পড়ুয়া স্থান করে নিয়েছেন মেধা তালিকায়।
শামসুল হুদা রোডের বাসিন্দা গোলাম বাবা ও দাদার সঙ্গে বৃহস্পতিবার সকালে স্কুলে এসেছিলেন। বাবা মহম্মদ তাজুদ্দিনের একটি চায়ের দোকান আছে পার্ক সার্কাসে। গোলামরা চার ভাই আর দুই বোন। কষ্টের সংসারে অদম্য লড়াইয়ের কাহিনি শোনালেন এই ছাত্র। বললেন, ‘বি কম নিয়ে পড়ব। তার সঙ্গে সিএ (চাটার্ড অ্যাকাউনটেন্ট) পড়াও শুরু করব। প্রথম পছন্দ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ।’ গোলামের অবসর কাটে ক্রিকেট খেলে। প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। প্রতি বিষয়েই একজন করে গৃহশিক্ষক ছিল তাঁর। রাজনীতি নিয়ে তাঁর কোনো উত্সাহ নেই। ছোটো একটি ঘরে আট জনের সংসার তাঁদের। চা বিক্রেতা বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সন্তানদের ঠিকমতো পড়াশোনা করাতে। বাবা বলেন, ‘এত ভালো ফল হবে ভাবিনি। আমরা সবাই খুব খুশি।’ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাজদার আলি মির্জা বলেন, ‘আমরা খুবই গর্বিত। বাণিজ্য বিভাগের স্যাররা গোলামকে নিয়ে উত্সাহী ছিলেন।’
এর পাশাপাশি মহেশতলার বাসিন্দা মৌপিয়া পাল খুবই ‘সিরিয়াস স্টুডেন্ট’। তিনি প্রথম শ্রেণি থেকে পড়াশোনা করছেন নিউ আলিপুরের শ্রী সারদা আশ্রম বালিকা বিদ্যালয়ে। ৪৮৯ নম্বর পেয়ে রাজ্যে তাঁর স্থান অষ্টম। বললেন, ‘রাশিবিজ্ঞান নিয়ে পড়ব। তারপরের কথা পরে ভাবব। কোনও বাঁধাধরা সময় নিয়ে পড়াশোনা করতাম না। যখন ভালো লাগত পড়তে বসতাম। অবসরে ইউটিউব দেখে ইউকুলেলে বাজাতাম। অঙ্ক ও রাশিবিজ্ঞানে আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন।’ রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে মৌপিয়া কি ভাবেন? বলেন, ‘শুধু চাই রাজ্য শান্তিতে থাকুক।’ মৌপিয়ার মা মিঠু পাল বললেন, ‘আমার এবং ওর বাবার প্রথম লক্ষ্য হল, ছেলে-মেয়েকে পড়াশোনা করানো। ওর দাদা এখন চাকরি নিয়ে বেঙ্গালুরুতে আছে।’ স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা প্রব্রাজিকা বিদ্যা প্রাণা বললেন, ‘আমরা অনেকদিন চাইছিলাম, আমাদের স্কুলের পড়ুয়ারা মেধা তালিকায় স্থান পাক। আজ তো অনেক শিক্ষিকার চোখে জল এসে গিয়েছে।’ এছাড়া স্কটিশচার্চ কলেজিয়েট স্কুলের অমৃতাংশু সাহু ৪৮৮ পেয়ে রাজ্যে নবম হয়েছেন। ওঁর বাবা চঞ্চল সাহু পার্ক স্ট্রিটের এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রসায়নের শিক্ষক। মা অপর্ণা সাহু গৃহবধূ। আগামী দিনে চিকিৎসক হতে চান ঘুঘুডাঙার বাসিন্দা অমৃতাংশু।
এর পাশাপাশি রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুলের অদ্রিজা গণ কলকাতার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ৪৮৭ নম্বর পেয়ে নিমতার বাসিন্দা অদ্রিজা রাজ্যের মধ্যে দশম স্থান অধিকার করেছেন। গোলামের মতোই অদ্রিজার জীবনে রয়েছে অদম্য লড়াইয়ের কাহিনি। ছোট বয়সেই মারণ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। লাগাতার লড়াই করেছেন। এবং জিতেছেন জীবন যুদ্ধে। এবার জিতলেন পরীক্ষার ময়দানে।