• সত্যি কথা বলছি ছবির ব্যবসার হিসাব রাখা ছেড়ে দিয়েছি, যখন স্বচ্ছ ধারণা পাব, তখন ভাবব: আবীর
    আনন্দবাজার | ১৫ মে ২০২৬
  • এখন গ্রীষ্মের ছুটিতে সিনেমা দেখতে যাওয়ার রেওয়াজ। এই সময়ের কথা মাথায় রেখেই পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি করেছেন ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’। অর্থাৎ আবার পর্দায় সোনাদার রোমাঞ্চ। নতুন যাত্রার কাহিনিই শোনালেন পরিচালক ধ্রুব এবং ‘সোনাদা’ আবীর চট্টোপাধ্যায়। শুনল আনন্দবাজার ডট কম।

    প্রশ্ন: গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলো কেমন কাটত আপনাদের?

    ধ্রুব: আমি তো প্রাগৈতিহাসিক! আমাদের সময়ে তো গরমের ছুটি মানে ছিল কাছের আত্মীয়দের বাড়ি ঘুরতে যাওয়া। আশির দশকের সময়ের কথা বলছি। তখন সব ভাই-বোন এক জায়গায় হতাম। দুষ্টুমি আর খেলা। আর ছুটিতে বাবা ঘুরতে যাওয়ার দারুণ একটা পরিকল্পনা করতেন। মা-বোন, আমি আর বাবা বেরিয়ে পড়তাম। ট্রেনে করে ঘুরতে যেতাম। হোল্ডঅল নিয়ে যেতাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ট্রেনের সবাই পরিবার হয়ে যেতেন। এখন আমরা সম্পর্কের গল্প বলি পর্দায়। কারণ, সেই সম্পর্কগুলো বাস্তবে আর হয় না। তখন শুধু এমন সম্পর্কগুলোই ছিল। প্রচুর গল্পের বই পড়তাম গরমের ছুটিতে।

    আবীর: হ্যাঁ, বেডিং নিয়ে যাওয়া হত। আমিও তো প্রায় প্রাগৈতিহাসিক! আমিও খুব গল্পের বই পড়তাম। আমার দাদুভাই (মায়ের বাবা) খুব ভাল গল্প বলতে পারতেন। মামার বাড়ি কাছেই ছিল। তাই ছুটিতে দাদুভাইয়ের কাছে গেলে, আগেই ওঁরা আমাকে বলতেন কী কী খাব, তার যেন একটা তালিকা করে দিই। খুব ভাল লাগত। আমিও দিয়ে দিতাম। পড়াশোনা তো বন্ধ। ছাদে গিয়ে ঘুমোতাম। প্রচুর আম খেতাম। তখন অবশ্য এতটা গরম পড়ত না। একটু বড় হওয়ার পরে তো চারটে বাজলেই ফুটবল খেলতে চলে যেতাম।

    ধ্রুব: গরমের ছুটিতে আচার খেতিস আবীর? ছাদে বসে আচার খাওয়া আর রেডিয়ো শোনা, সে সব গিয়েছে এক দিন।

    আবীর: হ্যাঁ, তা আর বলতে। আমের আচার খেতাম। তখন তো লোডশেডিংও খুব হত। তাই ছাদই তখন প্রিয় জায়গা ছিল। আমি তোমার থেকে সামান্যই ছোট। তাই মোটামুটি একই সময় কেটেছে।

    প্রশ্ন: আবীর-ধ্রুবর যাত্রাও তো প্রায় ৯ বছরের, শুরু হল কী ভাবে?

    আবীর: না, আমার আর ধ্রুবদার যাত্রার কিন্তু ১০ বছর হয়ে গিয়েছে। কারণ, প্রথম গল্প শুনেছিলাম ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে। কিন্তু তখন ছবিটা বিভিন্ন কারণে হয়ে ওঠেনি। কিন্তু জানেন তো, এখন বলছি বলে মনে হচ্ছে, ১০ বছর হয়ে গিয়েছে! এতটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে, এটা অনুভবই করিনি। বড়পর্দায়ও সেই পরিবর্তন বোঝা যাবে না, আশা করছি। এত তাড়াতাড়ি আমাকে সোনাদা বলে ডাকতে শুরু করবে সবাই, সেটা আশা করিনি। এখনও অনেকে ব্যোমকেশ বলেন। ছোটদের থেকে এত ভাল প্রতিক্রিয়া আশা করিনি। ধ্রুব আমাকে সোনাদা দিয়েছে, আমি খুবই কৃতজ্ঞ।

    প্রশ্ন: পরিচালক ধ্রুবর কাছে কে এগিয়ে? সোনাদা, ব্যোমকেশ না ফেলুদা? তিনটি চরিত্রেই তো আবীর অভিনয় করেছেন।

    ধ্রুব: আমি আবীরকে অভিনেতা হিসাবে এগিয়ে রাখব। সোনাদা, ব্যোমকেশ, ফেলুদার ঊর্ধ্বে গিয়ে। এটা কিন্তু সহজ কথা নয়। একটা ইন্ডাস্ট্রি ‘টাইপকাস্ট’ করার চেষ্টা করছে, অথচ সেই অভিনেতা প্রতি বার নতুন করে নিজেকে উপস্থাপন করছে। এটা কি সহজ? এটা তো সেই শিল্পীর অভিনয়সত্তার পরিচয় দেয়। প্রতি বার প্রতিটি চরিত্রে নতুনত্ব নিয়ে আসছে। এটাকে তো মান্যতা দিতেই হবে। অভিনেতা আবীর অনেক এগিয়ে।

    আবীর: আমার তো এখানে কিছু বলার জায়গাই নেই।

    প্রশ্ন: গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয় করতে করতে আবীরের কি কখনও মনে হয়েছিল ‘টাইপকাস্ট’ হয়ে যাচ্ছেন?

    আবীর: না। সেটা মনে হলে তো চরিত্রগুলোয় অভিনয় করতে রাজিই হতাম না। বরং মনে হয়েছে, কত নতুন নতুন ভাবে নিজেকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা যায়।

    প্রশ্ন: সোনাদা ফ্র্যাঞ্চাইজ়ির জন্য তো বহু জায়গায় শুটিং করেছেন। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া। আর এই বারে আবার সুন্দরবন। কোথায় শুটিং করে ভাল লেগেছে বেশি?

    আবীর: সত্যি বলছি, সুন্দরবন শুটিং করার জন্য উপযুক্ত জায়গা নয়। তাই আরও বেশি ধন্যবাদ জানাতে চাইব আমাদের গোটা টিম এবং ওখানে যাঁরা আমাদের সঙ্গে সারা ক্ষণ ছিলেন তাঁদের। অবশ্যই জয়দীপ কুন্ডুকে। ওঁদের তো সুন্দরবনের সবটা চেনা-জানা। কিন্তু, সুন্দরবনের এই সৌন্দর্যের কথা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। সেটা দুর্ভাগ্য। কী যে সুন্দর জায়গা! দৃষ্টিনান্দনিকতার দিক থেকে বলছি। অনেক পরিকল্পনা করে গিয়েছিলাম আমরা। আউটডোরে গিয়ে বিশ্রাম পাওয়া যায় না। সেটাও পেয়েছি আমরা।

    ধ্রুব: সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে কোনও কিছু করা সম্ভব নয়। অন্য ছবির তুলনায় এই ছবিতে শিল্পীদের কায়িক পরিশ্রম অনেক বেশি ছিল। তাই আরও বেশি করে পরিকল্পনা করেছিলাম। ওঁরাও ছিলেন সেই পরিকল্পনায়।

    প্রশ্ন: ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’-এর আগের তিনটি ছবিই তো সাফল্য পেয়েছে সব দিক থেকে। ছবি হিট হল কি না, ভাল ব্যবসা করছে কি না— এগুলো নিয়ে কে বেশি ভাবেন?

    ধ্রুব: আবীর বা আমি কেউই ভাবি না মনে হয়।

    আবীর: এই উত্তরটা আমি একটু দেব?

    প্রশ্ন: হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন।

    আবীর: সত্যি বলছি, আমি এখন আর ভাবি না। এটা শুনে আবার আমি খুব আত্মবিশ্বাসী, সেটা ভাবার কোনও কারণ নেই। আমাদের কাজ একটা ছবিকে যত্ন নিয়ে তৈরি করা। চেষ্টা করা, প্রচারের মাধ্যমে যত সম্ভব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তার পর কিন্তু আমাদের হাতে কিছু নেই। যে অঙ্কের হিসাবের কথা বলছেন, ওটা তো আমার বিষয়ই নয়। ওটা নিয়ে ভেবে আমি নিজের মাথা কেন খারাপ করব! সোনাদা আর কী নতুন করতে পারে, সেটা আমি ভাবতে পারি। নিশ্চিত ধ্রুবর মাথাতেও গল্পের নতুনত্ব, সৃজনশীলতা নিয়ে ভাবনা চলে। বাকিটা ভেবে আমরা কিছু করতে পারব না।

    ধ্রুব: প্রথম ছবি থেকে এখনও পর্যন্ত এই ভাবেই চলেছি। ব্যবসা কখনও আমাকে চিন্তায় ফেলেনি। মুক্তি পাওয়ার আগের মুহূর্ত অবধি আমি চূড়ান্ত টেনশন করি। তার পরে নয়।

    আবীর: ধ্রুব আমাকে মুক্তির আগে ছবিটা দেখতেও বলেছিল। আমি বলেছি, না দেখব না। কারণ, তখন যদি খুঁত বার করি, কিছু করার থাকবে না। আমি নিশ্চিত, আমার অনেক কিছু মনে হবে ছবি দেখতে দেখতে।

    প্রশ্ন: এখন তো ছবির ব্যবসা নিয়েও সমাজমাধ্যমে বিপুল আলোচনা হয়। প্রযোজক-পরিচালকের দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এগুলো কি দেখেন?

    ধ্রুব: আমার একটা সুবিধা আছে, সমাজমাধ্যমে আমি নেই। কিছু করি না। আমার কোনও আগ্রহই নেই। আমার স্ত্রী অনেক সময় খবর দেন। কিন্তু স্পষ্ট বলে দিই, কিছু জানতে চাই না। এটাই আমার শান্তি যে, জানতেই পারি না আমাকে নিয়ে ভাল কথা হচ্ছে, না কি খারাপ কথা! আসলে আমরা তো তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েছি ইদানীং, তাই সমস্যা বেশি হচ্ছে। এটা থেকে বেরিয়ে এলে সত্যিটা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।

    আবীর: গত দু’বছরে আমিও সমাজমাধ্যম থেকে দূরে। সবটাই সামলায় আমার টিম। তাঁরাই সব করেন। কাজের জিনিস ছাড়া আর কিছু পোস্ট করি না আমি। প্রয়োজনও মনে হয় না। গত ১৫ বছরে সমাজমাধ্যমে কোনও ছবির ব্যবসা নিয়ে কোনও মন্তব্য করিনি। কারণ, এটা আমার কাজ নয়। যে দিন স্বচ্ছ হিসাব পাব, তখন হিসাব নিয়ে আলোচনা করব।

    প্রশ্ন: অনেকেই তো আপনাকে খুব সাবধানি বলে। চট করে আবীরের থেকে উত্তর পাওয়া যায় না, এমন কথাও শোনা যায়।

    আবীর: সেটাই তো আমার শিক্ষা, রুচির পরিচয়। আমি না ভেবে কথা বলব কেন? খুব ঘনিষ্ঠ ছাড়া কারও সামনে যা খুশি বলব কেন? আর যাঁরা সমাজমাধ্যমে মন্তব্য করছেন, দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছেন, সেটা তাঁদের ব্যাপার। তথ্য সবই রাখি। কিন্তু আমি কেন ঢুকব তাতে?

    প্রশ্ন: অর্থাৎ দেব এবং স্বরূপ বিশ্বাসের দ্বন্দ্বের খবর রেখেছিলেন?

    আবীর: গত পাঁচ বছর ধরে আমি ‘আর্টিস্ট ফোরাম’-এর সক্রিয় সদস্য। যে কোনও ইন্ডাস্ট্রিতে সমস্যা থাকে। কিন্তু বিষয়টা হল, সেই সমস্যা ঘরের দরজা বন্ধ করে মেটাব, নাকি সবাইকে জানিয়ে মেটাব। মতান্তর যে কারও সঙ্গে হতে পারে। সেটা সবাইকে জানিয়ে কী করব! এটা আমার মত। আমি নিজের ভাবনা কারও উপরে চাপিয়ে দিতে চাই না। আমার উপরেও কেউ নিজের মত চাপিয়ে দিক, সেটা চাই না।

    প্রশ্ন: ছবি ছাড়া ছোটপর্দায় কাজ তো একটা বড় অংশ আপনার জীবনে...

    আবীর: হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। ছোটপর্দায় সঞ্চালনার ভূমিকায় কাজ করছি, তাই এত বেছে কাজ করতে পারি। সেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাচ্ছি বলেই আমি বড়পর্দায় এই ভাবে কাজ করতে পারছি।

    প্রশ্ন: রাজনৈতিক পালাবদল হল। টালিগঞ্জেও শিল্পীদের উপরে রাজনীতির রং থাকবে না, এমন অনেক কথা উঠে আসছে। কী বলবেন?

    আবীর: সবে এই পরিবর্তন এসেছে। এখন কিছু বলাই উচিত হবে না আমাদের। আগে দেখি। সময় যাক। তাই এখনই প্রতিক্রিয়া দেওয়া ঠিক হবে না।

    ধ্রুব: আমিও আবীরের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে সহমত।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)