নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আর জি কর কাণ্ডে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে দিল রাজ্য সরকার। আর প্রথম দফায় সরাসরি কোপ পড়ল ‘অভিযুক্ত’ পুলিশকর্তাদের উপর। নির্যাতিতার মাকে ঘুষের টোপ, কর্তব্যে গাফিলতি এবং সাংবাদিক সম্মেলনে অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে শুক্রবার তিন আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। শাস্তির খাঁড়া নেমে এল তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, কলকাতা পুলিশের তৎকালীন ডিসি নর্থ অভিষেক গুপ্তা এবং ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের উপর।
সরকারে এসেই মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্র সচিবের থেকে তৎকালীন সময়ে অভয়া ধর্ষণ-খুন কাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রিপোর্ট চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই এদিন এই তিন আধিকারিকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়েছে। শুক্রবার নবান্ন সভাঘরে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে আমি জানাচ্ছি, ওই সময় পরিস্থিতি মিসহ্যান্ডল করা হয়েছিল এবং একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসাবে পুলিশের প্রাথমিকভাবে যে এফআইআর ও তদন্ত করা উচিত ছিল, তা সন্তোষজনক ছিল না। সবটাই খতিয়ে দেখা হয়েছে। আমরা সিবিআই তদন্তের মূল অংশে বা আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছি না।’
তবে তাঁর বার্তা স্পষ্ট, আর জি কর কাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা আরও তলিয়ে দেখতে চাইছে বিজেপি সরকার। অভয়ার মায়ের অভিযোগ ছিল, পূর্বতন সরকারের তরফে দুই পুলিশ আধিকারিক তাঁকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন। কার নির্দেশে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? এর সঙ্গে আর কে কে জড়িয়ে? প্রতিটি বিষয়ই খুঁজে বের করতে চাইছে সরকার। আর সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, অভিযোগ ওঠা সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকরা কর্মরত অবস্থায় থাকলে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। এই মর্মে এদিন তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা মনে করি, এই তদন্ত স্বচ্ছভাবে করতে গেলে অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের সাসপেনশনে রাখা উচিত। কার নির্দেশে এই কাজ হয়েছিল, তা ইন্টারনাল ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং এবং ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারিতে উঠে আসবে। ভিকটিমের পরিবার চাইলে আমাদের অফিসাররা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বক্তব্য রেকর্ড করবেন। ফোনকল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট সবকিছুই তদন্তের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বের করা হবে।’
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেই অভয়ার মা তথা পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ জানিয়েছেন, ‘এই নির্দেশটা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও দিতে পারতেন। কারণ তাঁর অধীনেই আমার মেয়ে স্বাস্থ্যদপ্তরে চাকরি করত। কিন্তু তিনি গোটা ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর আমাদের নতুন যিনি মুখ্যমন্ত্রী, তিনি ফাইলটা খোলার ব্যবস্থা করেছেন। এটাই তফাৎ।’
আর জি কর কাণ্ডের সময় সংবাদিক সম্মেলন করতে দেখা গিয়েছিল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ছিলেন না। আবার নির্দিষ্ট বিষয়ে কথা বলার জন্য লিখিত কোনো দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্যে মাতৃশক্তির অপমান হয়েছে বলেই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দুবাবু। তাঁর কথায়, ‘জনসাধারণের সামনে একজন ডিসি প্রেস কনফারেন্সে যে মনোভাব ও ভাষা ছিল, তা অত্যন্ত অসম্মানজনক।’
সাসপেন্ড হওয়া আধিকারিকদের বিরুদ্ধে রাজ্যের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? এবিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্র সচিবের তত্ত্বাবধানে, ক্যাডার রুলস মেনে এই তিন আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হবে। এঁরা যেহেতু কেন্দ্রীয় ক্যাডারের আধিকারিক, সেই কারণে নয়াদিল্লিতে তাঁদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হবে।