এই সময়, হাওড়া: কলকাতার মতো এ বার কি হাওড়া শহরেও বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে বুলডোজ়ার ব্যবহার করা হবে? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক হচ্ছে হাওড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে। হাওড়া জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কলকাতার পাশাপাশি হাওড়া শহরেও বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে কড়া পদক্ষেপ করবে প্রশাসন। দরকার পড়লে এখানেও বুলডোজ়ার দিয়ে বেআইনি বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ২১ মে হাওড়া জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই বৈঠকে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা ছাড়াও বিজেপি বিধায়করা হাজির থাকবেন। সেই বৈঠকে হাওড়ার বেআইনি নির্মাণ, জল জমার সমস্যা, জঞ্জাল সাফাই, পানীয় জলের সমস্যা–সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। সেখান থেকেই তৈরি হবে আগামী দিনের হাওড়ার উন্নয়নের রূপরেখা। ওই দিনই মুখ্যমন্ত্রীর বেলুড় মঠে যাওয়ার কথা রয়েছে।
উত্তর হাওড়ার বিজেপি বিধায়ক উমেশ রাই বলেন, ‘বেআইনি বাড়ির বিষয়টির সঙ্গে পুরসভা-সহ একাধিক দপ্তর জড়িত রয়েছে। তাই সব দিক খতিয়ে দেখে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মানুষের নিরাপত্তা এবং শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন যাতে বজায় থাকে, সেই দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
হাওড়া পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের ইঞ্জিনিয়াররা জানাচ্ছেন, কলকাতার মতো হাওড়া শহরেও অসংখ্য বেআইনি বাড়ি তৈরি রয়েছে। যে সব এলাকায় তিনতলার বেশি নির্মাণের অনুমতি নেই, সেখানেও নিয়ম ভেঙে পাঁচতলা–ছ’তলা বাড়ি উঠে গিয়েছে। সালকিয়া, পিলখানা, শিবপুর, কদমতলা, দাসনগর-সহ উত্তর ও মধ্য হাওড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই ধরনের বেআইনি বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। পুরসভার এক আধিকারিকের কথায়, ‘শুধুমাত্র উত্তর হাওড়ার পিলখানা এলাকাতেই কয়েক হাজার বেআইনি নির্মাণ হয়েছে। এই সব এলাকায় মূলত সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ বসবাস করেন। বাসিন্দাদের অনেকেই ভিন রাজ্যের বাসিন্দা। তাঁরা এখানকার ভোটারও নন। তাছাড়া এটা অপরাধীদের একটা ডেরা। সেখানে বেআইনি বাড়ি ভাঙতে গেলে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেই ভয়ে পুরকর্মীরা ওখানে ঢুকতেই ভয় পান।’ তিনি জানিয়েছেন, শহরে বেআইনি ফ্ল্যাট বেড়ে যাওয়ায় নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বেড়ে গিয়েছে। এই সমস্যার মোকাবিলায় বুলডোজার দাওয়াই চাইছেন পুর আধিকারিকরা। আম নাগরিকদের একাংশ বুলডোজ়ারের পক্ষে সওয়াল করছেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, হাওড়ার পুরোনো বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলিতে বহু বছর ধরেই বেআইনি নির্মাণ হচ্ছে। সবটাই চলছে রাজনৈতিক মদতে। প্রশাসনের একাংশও তার সঙ্গে জড়িত। কোথাও রাস্তা দখল করে, কোথাও আবার বাধ্যতামূলক ফাঁকা জায়গা না রেখেই বহুতল বাড়ি উঠে যাচ্ছে। এর ফলে আগুন কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বড়সড় বিপদের আশঙ্কা করছেন অনেকে।
উত্তর হাওড়ার সালকিয়ার বাসিন্দা অমিত সাহা বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আগে ছোট ছোট বাড়ি ছিল। এখন সেখানে ৮-১০ তলা বাড়ি উঠে গিয়েছে। রাস্তা এতটাই সরু যে দমকলের গাড়ি ঢুকতেই পারবে না। প্রশাসন এতদিন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা চাই, কলকাতার মতো হাওড়াতেও বেআইনি নির্মাণের প্রশ্নে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিক। দরকার পড়লে বুলডোজ়ার চলুক।’
পিলখানার বাসিন্দা রহিম আনসারি বলেন, ‘বেআইনি বাড়ির জন্য শহরের নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই জল জমে যায়। এঁদের জন্য যাঁরা নিয়ম মেনে বাড়ি করেন, তাঁরা সমস্যায় পড়ে যাচ্ছেন। বেআইনি বাড়ির জল ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া উচিত।’
শিবপুরের বধূ সুমিতা দাসের বক্তব্য, ‘শুধু জরিমানা করে লাভ হবে না। যে সব বাড়ি পুরোপুরি বেআইনি, সেগুলোর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা ঘটবে।’
দাসনগরের ব্যবসায়ী রাজীব গুপ্ত বলেন, ‘কলকাতায় যে ভাবে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, হাওড়াতেও সেই একই ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা চায়।’